ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র প্রস্তাবিত ‘যন্তর মন্তর ২.০’ বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজধানী দিল্লি। শনিবার (১০ অক্টোবর) নির্ধারিত এই কর্মসূচি ঘিরে সম্ভাব্য সহিংসতা ঠেকাতে রাজধানীজুড়ে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। একই সঙ্গে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে আরোপ করা হয়েছে একাধিক বিধিনিষেধ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শুক্রবার রাত ১০টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার জন্য মধ্য দিল্লির বিস্তীর্ণ এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের ডেপুটি কমিশনার মনিষী চন্দ্রের জারি করা জরুরি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, জনপথ ও কর্তব্য পথের মোড়কে কেন্দ্র করে চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
ভোট কারচুপির অভিযোগ, সিইসির পদত্যাগের দাবি
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম এবং ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে সিজেপি। দলটির কর্মী, ছাত্র সংগঠন, সাধারণ নাগরিক ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর একাংশ এই আন্দোলনে সমর্থন জানাচ্ছে।
আন্দোলনকারীরা বিপুলসংখ্যক সমর্থক নিয়ে দিল্লিতে মিছিল করার ঘোষণা দেওয়ায় রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে যন্তর মন্তর ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি।
২৮ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের দাবি
বিক্ষোভ মোকাবিলা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দিল্লিজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (সিএপিএফ) প্রায় ২৩ হাজার সদস্য এবং দিল্লি পুলিশের আরও পাঁচ হাজার সদস্যসহ মোট ২৮ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
যন্তর মন্তরগামী প্রধান সড়কগুলোতে বসানো হয়েছে কাঁটাতার ও ভারী ব্যারিকেড। পাশাপাশি মধ্য দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এর আওতায় জনসমাবেশ, মিছিল এবং পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলা হয়েছে।
মেট্রো, রেল ও গণপরিবহনে বিধিনিষেধ
বিক্ষোভের কারণে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিধিনিষেধগুলো হলো—
মেট্রো স্টেশন বন্ধ: শুক্রবার রাত ৯টা থেকে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দিল্লির বিভিন্ন এলাকার ৪৫টি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তালিকায় রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, প্যাটেল চক, জনপথ ও মান্ডি হাউসের মতো স্টেশন রয়েছে। তবে ট্রেন বদলের জন্য ইন্টারচেঞ্জ সুবিধা চালু রাখার কথা বলা হয়েছে।
রেল চলাচলে বিঘ্ন: শনিবার ভোর ৪টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন চলাচল স্থগিত রাখার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় চলাচলের কথা থাকা দূরপাল্লার কিছু ট্রেনের যাত্রা বাতিলের দাবিও করা হয়েছে।
অ্যাপভিত্তিক পরিষেবায় নজরদারি: উবার ও ওলার মতো রাইড শেয়ারিং পরিষেবার ওপর নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি খাবার সরবরাহকারী অ্যাপের বড় অর্ডারগুলোর ওপরও পুলিশের নজরদারি থাকার দাবি করা হয়েছে।
সীমান্তে তল্লাশি: হরিয়ানা, রাজস্থান ও উত্তর প্রদেশের সঙ্গে দিল্লির সংযোগস্থলগুলোতে তল্লাশিচৌকি বসানোর কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
মদের দোকান ও আরআরটিএস স্টেশন বন্ধ: ৯ ও ১০ অক্টোবর দিল্লির খুচরা মদের দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ এবং সারাই কালে খান ও নিউ অশোক নগরের ‘নমো ভারত’ বা আরআরটিএস স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের কথাও বলা হয়েছে।
রাজপথ ছাড়তে নারাজ আন্দোলনকারীরা
সিজেপি নেতা অভিজিৎ ডিপকের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশাসনিক বাধা সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি থেকে সরে আসবেন না। যেকোনো পরিস্থিতিতে যন্তর মন্তরের দিকে পদযাত্রা চালিয়ে যাওয়ার অবস্থানে রয়েছেন তাঁরা।
একদিকে আন্দোলনকারীদের অনড় অবস্থান, অন্যদিকে প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা—সব মিলিয়ে দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ, মেট্রো ও রেল পরিষেবা স্থগিত, বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং অন্যান্য বিধিনিষেধসংক্রান্ত দাবিগুলোর সত্যতা নির্ভরযোগ্য সরকারি সূত্র থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর