• ঢাকা
  • ঢাকা, রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ৬ সেকেন্ড পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:৩৪ রাত

হোটেলের খাতায় নাম ‘তানজু’, এরপর করুণ পরিণতি

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

কক্সবাজারের কলাতলী। কুটুমবাড়ি রোডের শেষ মাথায় তিনতলা একটি আবাসিক হোটেল। ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে সেখানে হাজির হন এক কিশোরী ও এক যুবক। হোটেলের ৩০২ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেওয়ার সময় কিশোরীকে যুবকের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। রেজিস্টারে তার নাম লেখা হয় ‘তানজু আক্তার’, বয়স ১৮ বছর।

কিন্তু তার প্রকৃত নাম জান্নাতুল তাজমিন। বয়স মাত্র ১৫ বছর। কুমিল্লার এই স্কুলছাত্রী পরদিন হোটেল থেকে বেরিয়ে ওঠেন কুমিল্লাগামী বাসে। গন্তব্য বাড়ি। রাত পৌনে ১২টার দিকে বাস থেকে নামেন কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডে। এরপর বাসায় ফেরার জন্য ভাড়া করেন একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। সেই যাত্রাই হয়ে ওঠে তার শেষ যাত্রা।

পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়া তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করেন। পরদিন সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার একটি ধানখেত থেকে উদ্ধার করা হয় তাজমিনের মরদেহ। পরে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সুমনকে।

পুলিশের ভাষ্য, তিনি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

হোটেলের রেজিস্টার, বাসের টিকিট, সিসিটিভি ফুটেজ, পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য এবং রাজুর ঘনিষ্ঠজনদের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে তাজমিনের শেষ যাত্রাপথের একটি সময়রেখা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর কয়েক দিনের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও কক্সবাজার ঘুরে আবার কুমিল্লায় ফিরছিলেন তিনি। কিন্তু তার যাত্রাপথের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়ে গেছে কিছু প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে কুটুমবাড়ি-সংলগ্ন সড়কের শেষ মাথায় অবস্থিত মেঘলা রিসোর্ট। হোটেলটির রেজিস্টারের তথ্য অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে সেখানে ওঠেন তাজমিন। তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ৩০২ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন। রেজিস্টারে তাজমিনের নাম লেখা হয় ‘তানজু আক্তার’। বয়স উল্লেখ করা হয় ১৮ বছর। আর রিয়াজের পরিচয় লেখা হয় বান্দরবানের লামা এলাকার মনির আহমদের ছেলে হিসেবে।

হোটেলের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এক রাত থাকার পর ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তারা হোটেল ছেড়ে চলে যান। হোটেলের রেজিস্টারে রিয়াজের দুটি মুঠোফোন নম্বর ও একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বরও লেখা রয়েছে। এর মধ্যে একটি নম্বর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য উল্লেখ করা হয়েছে।

হোটেলের রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য থেকে কক্সবাজারে তাজমিনের অবস্থানের তথ্য মিলেছে।

রিয়াজের এক সহকর্মীর ভাষ্য, ফেসবুকে ১৭ দিন আগে তাজমিনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। নিয়মিত বার্তা আদান-প্রদানের পাশাপাশি তারা পরস্পরকে রিলস পাঠাতেন। ফেসবুকের আগে ইনস্টাগ্রামেও তাদের যোগাযোগ ছিল বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে রিয়াজের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের দাবি, প্রায় পাঁচ মাস আগে তাজমিনের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় হয়। এরপর থেকে তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে তাজমিনের ঝগড়া হয়। এরপর তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যান। পরে কুমিল্লায় ফিরে রিয়াজের সঙ্গে যোগাযোগ করে কক্সবাজারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

তাজমিনের কক্সবাজার যাত্রার খরচের একটি অংশও এসেছিল রিয়াজের কাছ থেকে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাকে বিকাশের মাধ্যমে ৫০০ টাকা পাঠিয়েছিলেন রিয়াজ।

৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় মেঘলা রিসোর্টে ওঠার পরদিনই কক্সবাজার ছাড়েন তাজমিন। হোটেলের কর্মচারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তারা কক্ষ ছেড়ে বের হন। এরপর কুমিল্লায় ফেরার জন্য বাসের টিকিট কাটেন রিয়াজ।

কক্সবাজারের কক্সেস প্যানোরামিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির আবদুল্লাহর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর রাত ৮টার পর তাজমিন ও রিয়াজ তাদের কাউন্টারে যান। সেখানে পরদিনের জন্য আইকনিক এক্সপ্রেসের একটি টিকিট বুক করেন রিয়াজ। টিকিটের দাম ছিল ৯০০ টাকা বলে রিয়াজ তার এক সহকর্মীকে জানিয়েছিলেন। ওই সহকর্মীর ভাষ্য, রিয়াজের দাবি অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিনকে বাসে তুলে দেন তিনি।

অর্থাৎ, হোটেলে ওঠার পরদিন দুপুরেই কুমিল্লার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন তাজমিন। কিন্তু কেন তাঁকে দ্রুত ফিরে যেতে হয়েছিল, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, তাজমিনের যাত্রার পরিকল্পনা, বাসের টিকিট বুকিং এবং তাকে বাসে তুলে দেওয়ার ঘটনাগুলো তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, যাত্রাপথে কার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল এবং কোথায় নামবেন, সে বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তা জানা প্রয়োজন।

৭ অক্টোবর রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক এক্সপ্রেসের বাস থেকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের সামনে নামেন তাজমিন। সিসিটিভি ফুটেজে তার বাস থেকে নামার দৃশ্য দেখা গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এরপর শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন তিনি। সেই অটোরিকশার চালক ছিলেন মো. সুমন মিয়া (৩৫)।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি ফেরার পথে সুমন তাজমিনকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ করেন এবং পরে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন। পরদিন সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে বাস থেকে নামার পর তাজমিন ঠিক কোথায় অটোরিকশায় উঠেছিলেন, অটোরিকশাটি কোন পথে গিয়েছিল এবং হত্যাকাণ্ডের আগে কী ঘটেছিল, তার বিস্তারিত তথ্য তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন মনে করছে পুলিশ।

সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করেছে পুলিশ।

তাজমিন কুমিল্লার পথে থাকার সময়ও রিয়াজের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল বলে জানিয়েছেন রিয়াজের এক সহকর্মী। ওই সহকর্মীর দাবি, অটোরিকশায় ওঠার পর তাজমিন মুঠোফোনে রিয়াজের সঙ্গে কথা বলছিলেন। অটোরিকশাচালকের বিস্তারিত পরিচয়ও তিনি রিয়াজকে জানিয়েছিলেন বলে দাবি করেন ওই সহকর্মী।

ওই সহকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের মুঠোফোনের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরদিন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে তাজমিনের ধর্ষণ ও হত্যার খবর দেখে রিয়াজ স্তম্ভিত হয়ে পড়েন বলে দাবি করেন ওই সহকর্মী।

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, সুমন আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে অভিযুক্তের স্বীকারোক্তির পাশাপাশি অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, তাজমিনের সঙ্গে শেষবার কারা যোগাযোগ করেছিলেন, তার যাত্রাপথে আর কেউ যুক্ত ছিলেন কি না এবং ঘটনার আগে-পরে কী ঘটেছিল, সেসব তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। রিয়াজের এক সহকর্মী জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের পর রিয়াজ তার কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। এ ঘটনায় নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

সহকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, রিয়াজ তাকে বাঁচানোর জন্য আকুতি-মিনতি করেছিলেন। ওই সহকর্মী আরও জানান, রিয়াজ গত তিন বছর ধরে কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করছেন। ঘটনার পর থেকে তার মুঠোফোন বন্ধ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, মুঠোফোনের কললিস্টসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে তদন্ত চলছে। আসামি হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তদন্ত শেষ হলে বাকি বিষয়গুলো জানা যাবে।

তাজমিনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি পরিবার জানলেও তিনি কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে থাকছেন এবং কখন ফিরবেন, তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা ছিল না স্বজনদের।

তার মা কেয়া খাতুন সাংবাদিকদের জানান, বৃহস্পতিবার মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিল। তখন তাজমিন জানিয়েছিলেন, তিনি এক বান্ধবীর সঙ্গে আছেন। মেয়েকে বান্ধবীর বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে চাইলেও সেই বান্ধবীর পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাননি তিনি।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাজমিন মাকে বলেছিলেন, তিনি এক বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছেন। কিন্তু বান্ধবীর নাম ও তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলে কিছু জানাননি।

তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদের ভাষ্য, তাজমিন ছিলেন চঞ্চল স্বভাবের। মা অসুস্থ হলে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখভাল করতেন তিনি। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। মেয়েকে বাবা খুব আদর করতেন বলে জানান শিক্ষক। রাগ হলে তাজমিন কখনো কখনো হুটহাট বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতেন বলেও জানান তিনি।

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:

BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]