নড়াইলের চিত্রা নদীর পাড়ে একটি ছোট্ট মাঠের একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে মসজিদ ও মন্দির। মাঠের পশ্চিম পাশে জামে মসজিদ, আর উত্তর পাশে রয়েছে সার্বজনীন পূজা মন্দির। মন্দিরটি উত্তর-দক্ষিণমুখী। প্রায় চার দশক ধরে মিলেমিশে চলছে মুসলিমদের নামাজ আর হিন্দুদের পূজা-অর্চনা। সময়মতো হচ্ছে আজান ও নামাজ, নিয়ম করে চলে পূজাঅর্চনাও। সময় হলে কেউ যাচ্ছেন নামাজে, আর কেউ যাচ্ছেন দেবী দর্শনে। এক পাশে ধূপকাঠির ধোঁয়া আর উলুধ্বনি, অন্য পাশে জিকির ও আতরের সুঘ্রাণ। একদিকে মসজিদে জামাতে নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা, অন্যদিকে মন্দিরে চলে পূজা-অর্চনা।
ধর্মীয় সম্প্রীতির এমন উজ্জ্বল নিদর্শন রয়েছে চিত্রা নদীর পাড়ে নড়াইল পৌরসভার মহিষখোলা এলাকার মহিষখোলা পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদ ও মহিষখোলা সার্বজনীয় পূজা মন্দির এলাকায়। মহিষখোলা পুরাতন সাব রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদ ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর উত্তর-দক্ষিণমুখী মহিষখোলা সার্বজনীয় পূজা মন্দিরটি ও একই সময় প্রতিষ্ঠিত। স্থানটি প্রায় ৪৬ বছর ধরে সম্প্রতির এক অন্যন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। মসজিদ ও মন্দিরের মাঝখানে রয়েছে শরফি আব্দুল হাকিম ও নড়াইল এক্সপ্রেস হাসপাতাল। পুজার সময় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নির্ভিগ্নে পুজা করেন। নামাজের সময় মন্দির কমিটি তাদের কাজক্রম সীমিত রাখেন। নামাজ শেষ হলে স্বাভাবিক নিয়মেই পূজা-অর্চনার কাজ চলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নামাজের সময় মসজিদে মুসল্লিরা সমবেত হন। অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে মন্দিরে চলে পূজা-অর্চনা। নামাজের সময় মন্দির কমিটি তাদের কার্যক্রম সীমিত রাখে। নামাজ শেষ হলে আবার স্বাভাবিক নিয়মে চলে পূজার আনুষ্ঠানিকতা। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এভাবেই বজায় রয়েছে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। মসজিদ ও মন্দিরের এমন পাশাপাশি অবস্থান স্থানীয় মানুষের কাছে ধর্মীয় সম্প্রতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও একে অপরের বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার বিষয়টি এখানকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বছর নড়াইল জেলার তিন উপজেলায় মোট ৫৪৩টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে নড়াইল সদর উপজেলায় ২৪৯টি, লোহাগড়া উপজেলায় ১৫০টি এবং কালিয়া উপজেলায় ১৪৪টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই চিত্র শুধু নড়াইল শহরের মহিষখোলা এলাকারই নয়। মহিষখোলা মতো নড়াইল শহরের কুড়িগ্রাম এলাকায় নিশিনাথতলা মন্দির ও পুলিশ ফাঁড়ি জামে মসজিদ এবং পুলিশ লাইন জামে মসজিদ ও সর্বমঙ্গলা মন্দির ও পাশাপাশি অবস্থিত।
মহিষখোলা সার্বজনীন পূজামন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভংকর সরকার বলেন, ‘এ এলাকায় মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ বেশি হলেও কখনো পূজা অর্চনা করতে কোনো সম্যসার মুখোমুখি হইনি। ধর্ম নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। আমরা দুই ধর্মের মানুষ এখানে সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে আসছি। আমরা একে-অপরকে সাহায্য করি। প্রত্যেকেই নিজের ধর্ম পালনের পাশাপাশি অন্য ধর্মের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল।,
মহিষখোলা পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদের ইমাম মো. ইনামুল হক বলেন,‘পাশাপাশি মসজিদ-মন্দিরে নামাজ ও পূর্জার্চনা পালনে অতীতে কোনো সমস্যা হয়নি। ভবিষ্যতেও এ সম্প্রীতি বজায় থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।,
প্রতিবছর পূজার সময় দূরদূরান্ত থেকে অনেক দর্শনার্থী এই এলাকায় আসেন। একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির দেখে তাঁরা বিস্মিত হন এবং দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিদ্যমান সৌহার্দ্য ও সম্প্রতির প্রশংসা করেন। মন্দির ও মসজিদ পাশাপাশি থেকে ধর্মীয় সম্প্রতির অন্যন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। স্থানীয়দের চাওয়া আগামিতে ও যেন এই ধারা অব্যাহত থাকে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
এক্সক্লুসিভ এর সর্বশেষ খবর