কেউ হয়তো শেষ মুহূর্তে প্রাণ বাঁচাতে ছুটেছিলেন দরজার দিকে। কেউ খুঁজছিলেন বের হওয়ার পথ। কেউ হয়তো দমবন্ধ করা ধোঁয়ার মধ্যে একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার আশায় আশ্রয় নিয়েছিলেন বাথরুমে। কিন্তু একটি কক্ষে আগুনের সঙ্গে লড়াইয়ের শেষ দৃশ্যটি যেন অন্য এক গল্প বলে গেল। সেখানে এক নারী বুকে আগলে রেখেছিলেন একটি শিশুকে। আর এক পুরুষ নিজের শরীর দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন তাদের দুজনকে। আগুনের ভয়াবহতা থেকে প্রিয়জনকে বাঁচানোর সেই আকুল চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছিল কি না, তা জানা যায়নি। তবে উদ্ধারকর্মীদের চোখে ধরা পড়া দৃশ্যটি নাড়িয়ে দিয়েছে তাদেরও। আগুনে ঝলসে যাওয়া তিনটি শরীরের মধ্যে যেন ধরা পড়ে আছে মা-বাবার ভালোবাসা আর সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ আকুতি।
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে এক নারী, এক শিশু ও এক পুরুষের মরদেহ ছিল। তাদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে উদ্ধারকর্মীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে এমন এক দৃশ্য, যা আগুনের ভয়াবহতার পাশাপাশি সামনে এনেছে মানুষের অসহায়ত্ব আর স্বজনের প্রতি গভীর মমতার ছবি।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্যের ভাষ্য, নারীটি শিশুটিকে বুকের কাছে জড়িয়ে রেখেছিলেন বলে মনে হয়েছে। পুরুষটি নিজের শরীর দিয়ে তাদের দুজনকে আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনটি মরদেহই এত বেশি পুড়ে গেছে যে চেনার উপায় নেই বললেই চলে। তাদের পাশেই পাওয়া গেছে আরেক নারীর মরদেহ। ডিএনএ পরীক্ষার আগে তাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
শনিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পরও শেষ হয়নি উদ্ধার অভিযান। রিসোর্টের ভেতরে আরও কয়েকজন আটকা পড়ে থাকতে পারেন, এমন খবর পেয়ে আবারও তল্লাশি শুরু করেন উদ্ধারকর্মীরা।
দোলন আচার্য জানান, রিসোর্টের দোতলার একটি কক্ষ থেকে প্রথমে পাঁচটি পুড়ে যাওয়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে পাশের একটি কক্ষের বাথরুম থেকে পাওয়া যায় এক পুরুষের মরদেহ। তিনতলার একটি বাথরুম থেকে উদ্ধার করা হয় আরও চারটি মরদেহ।
আগুন থেকে বাঁচতে কয়েকজন বাথরুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে ধারণা করছেন উদ্ধারকর্মীরা। কিন্তু নিরাপদ আশ্রয় ভেবে যে জায়গায় তারা গিয়েছিলেন, সেখান থেকেও আর ফিরে আসা হয়নি অনেকের। রিসোর্টটির নির্মাণশৈলীতেও অগ্নিনিরাপত্তার বড় ধরনের ঘাটতি ছিল বলে জানিয়েছেন দোলন আচার্য। ভবনটির কলাম কংক্রিটের তৈরি হলেও বিম ছিল কাঠের। দেয়াল ও সিঁড়িতেও ব্যবহার করা হয়েছিল কাঠ ও বাঁশ। শুধু বাথরুমগুলো ছিল কংক্রিটের তৈরি, সেগুলোতে লাগানো ছিল টাইলস। আগুনের মধ্যে আটকে পড়া মানুষগুলোর জন্য এই নির্মাণশৈলী কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল, তা তদন্তের বিষয়। তবে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর অবস্থা বলে দিচ্ছে, সেই রাতে রিসোর্টের ভেতরে আটকে পড়া মানুষগুলোর জন্য পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ ছিল।
রিসোর্টটিতে অবস্থান করছিলেন ৪১ বছর বয়সী নাহিদুর রহমান তুহিন, তার স্ত্রী ৩৬ বছর বয়সী আফসানা মতিন তানজি এবং তাদের দুই মেয়ে, সাত বছরের রুজাইনা ইনায়া ও তিন বছরের সুনাইনা ইহানা। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
একটি পরিবারের চারজন মানুষ। দুই শিশুর সামনে ছিল বেড়ে ওঠার দীর্ঘ পথ। মা-বাবার হাত ধরে পৃথিবীকে নতুন করে চেনার কথা ছিল তাদের। কিন্তু ভয়াবহ আগুনের পর সেই পরিবারের তিন সদস্যের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর শঙ্কা।
তুহিনের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে তার ভাই, ভাবি ও তাদের এক সন্তান থাকতে পারেন বলে তারা ধারণা করছেন। তবে ডিএনএ পরীক্ষার ফল না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
একদিকে স্বজনদের অপেক্ষা, অন্যদিকে উদ্ধার হওয়া মরদেহের পরিচয় শনাক্তের অনিশ্চয়তা। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে পরিবারটির অসহনীয় সময়। তারা এখনো জানেন না, আগুনের রাতে ঠিক কী ঘটেছিল তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে।
যে তিনটি মরদেহ দেখে উদ্ধারকর্মীদের মনে হয়েছে, একজন মা সন্তানকে বুকে আগলে রেখেছিলেন আর একজন বাবা তাদের দুজনকে শরীর দিয়ে আড়াল করেছিলেন, সেই দৃশ্যের সঙ্গে নিখোঁজ পরিবারটির কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পরিবারের ধারণা ও উদ্ধারকর্মীদের পর্যবেক্ষণকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক শনাক্তকরণ।
আগুনের সামনে মানুষ কতটা অসহায় হয়ে পড়ে, তা এই অগ্নিকাণ্ডের উদ্ধার অভিযানে আবারও স্পষ্ট হয়েছে। ধোঁয়া, তাপ আর লেলিহান শিখার মধ্যে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে কেউ হয়তো নিজের জীবন বাঁচাতে ছুটেছেন, কেউ আবার শেষ মুহূর্তেও আঁকড়ে ধরেছেন প্রিয়জনকে।
টুপটুপ রিসোর্টের সেই তিনটি মরদেহের দৃশ্যও তেমন এক সম্ভাবনার কথা মনে করিয়ে দেয়। একজন মায়ের বুকে শিশুর অবস্থান আর একজন পুরুষের শরীর দিয়ে তাদের আড়াল করার চেষ্টার যে বর্ণনা দিয়েছেন উদ্ধারকর্মী, তা হৃদয় স্পর্শ করে। তবে তাদের শেষ মুহূর্তের সুনির্দিষ্ট ঘটনা এখনো অজানা।
স্বাধীন/সা.এ.
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর