সড়ক দুর্ঘটনা রোধ, প্রাণহানি কমানো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রত্যয় নিয়ে আজ ২২ অক্টোবর পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য—‘নিরাপদ সড়ক, সমৃদ্ধ দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ’। দিবসটি উপলক্ষে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ট্রাফিক আইন কার্যকর করা এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। কেউ হারাচ্ছেন পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে, আবার কেউ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিনের জন্য কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন। সড়ক দুর্ঘটনার এই ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যেও।
১৩ বছরে সড়কে প্রাণ গেছে ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি মানুষের
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার খবর পর্যবেক্ষণ করে এ পরিসংখ্যান তৈরি করেছে সংগঠনটি। তাদের মতে, প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশে বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়। তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫ হাজার ৪৯০ জন। তথ্য সংগ্রহ ও হিসাবের পদ্ধতিতে পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানে বড় ব্যবধান রয়েছে।
দুর্ঘটনার পেছনে যেসব কারণ
সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকের অদক্ষতা ও ক্লান্তি। এর পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ট্রাফিক আইন অমান্য, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো এবং পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনা কমাতে শুধু চালক বা পথচারীর সচেতনতা বাড়ালেই হবে না; সড়ক ব্যবস্থাপনা, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তায় নতুন আইনের উদ্যোগ
সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে। প্রস্তাবিত আইনে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের বিনামূল্যে জরুরি চিকিৎসা, আহত ব্যক্তিকে সহায়তাকারীদের আইনি সুরক্ষা, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ডিমেরিট পয়েন্ট এবং বারবার আইন ভাঙলে দ্বিগুণ জরিমানার বিধান রাখার প্রস্তাব রয়েছে। সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের লক্ষ্য নিয়েছে।
নিরাপদ সড়ক গড়তে প্রয়োজন সবার দায়িত্বশীলতা
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের মূল লক্ষ্য শুধু সচেতনতা তৈরি নয়, বরং সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ। এ জন্য চালকদের ট্রাফিক আইন মেনে চলা, নির্ধারিত গতিসীমা অনুসরণ, মোটরসাইকেল চালানোর সময় হেলমেট ব্যবহার, গাড়িতে সিটবেল্ট বাঁধা এবং পথচারীদের নির্ধারিত স্থান দিয়ে রাস্তা পার হওয়ার অভ্যাস জরুরি।
একই সঙ্গে সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা, পর্যাপ্ত ফুটপাত ও নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করা, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
সড়কে প্রতিটি প্রাণই মূল্যবান। তাই নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা কেবল একটি দিবসের অঙ্গীকার নয়; এটি রাষ্ট্র, পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সাধারণ নাগরিক—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। কার্যকর আইন প্রয়োগ, উন্নত সড়ক ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বশীল আচরণের সমন্বয়েই কমতে পারে দুর্ঘটনা, রক্ষা পেতে পারে অসংখ্য প্রাণ।
স্বাধীন/সা.এ.
সর্বশেষ খবর