মানুষের মুখের কথা যেমন অন্যের মনে আনন্দ জাগাতে পারে, তেমনি অসংযত কথাবার্তা থেকে সৃষ্টি হতে পারে বিবাদ, ভুল বোঝাবুঝি ও সম্পর্কের অবনতি। এ কারণে ইসলামে জিহ্বার হেফাজত এবং কথা বলার ক্ষেত্রে সংযমের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় কথা এড়িয়ে চলা, মিথ্যা ও পরনিন্দা থেকে বিরত থাকা এবং কথা বলার আগে তার পরিণতি চিন্তা করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ গুণ।
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, সব সময় কথা বলার চেয়ে কখন নীরব থাকতে হবে, তা বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে নীরবতা মানে অন্যায়ের সামনে মুখ বন্ধ করে থাকা নয়; বরং অনর্থক ও ক্ষতিকর কথাবার্তা থেকে নিজেকে বিরত রাখা।
চুপ থাকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
এই হাদিসের শিক্ষা হলো, কথা বলার আগে বিবেচনা করা উচিত, সেই কথা কল্যাণকর কি না। কথার মাধ্যমে যদি কারও উপকার করা সম্ভব হয়, তবে ভালো কথা বলা উচিত। আর কথা যদি অনর্থক, ক্ষতিকর কিংবা পাপের কারণ হয়, তাহলে নীরব থাকাই উত্তম।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি তাঁর দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী জিহ্বা এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী অঙ্গের হেফাজতের দায়িত্ব নেবে, তিনি তার জন্য জান্নাতের দায়িত্ব নেবেন। (সহিহ বুখারি)
হাদিসটি মানুষের কথাবার্তা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব তুলে ধরে।
চুপ থাকার ৫ উপকারিতা ও ফজিলত
১. মিথ্যা ও গুনাহ থেকে বাঁচা যায়
মিথ্যা বলা, গিবত করা, অপবাদ দেওয়া, গালাগাল করা এবং অন্যকে কষ্ট দেওয়ার মতো অনেক গুনাহ জিহ্বার মাধ্যমে সংঘটিত হয়। অসতর্ক কথাবার্তা কখনো কখনো মানুষকে এমন পাপে জড়িয়ে ফেলে, যার পরিণতি সম্পর্কে সে নিজেও সচেতন থাকে না।
কথা বলার আগে একটু চিন্তা করা এবং অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা এড়িয়ে চলার অভ্যাস এসব গুনাহ থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। তাই জিহ্বার হেফাজত আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
২. ঝগড়া-বিবাদ ও ভুল বোঝাবুঝি কমে
পরিবার, বন্ধুমহল কিংবা সামাজিক জীবনে অনেক বিরোধের সূত্রপাত হয় অসংযত কথাবার্তা থেকে। রাগের মাথায় বলা একটি বাক্যও কখনো দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে।
এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনের সময় নীরব থাকা, অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং উত্তেজিত অবস্থায় প্রতিক্রিয়া না দেখানো বিবাদ এড়াতে সাহায্য করে। সব কথার উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া জরুরি নয়। কখনো সময় নিয়ে কথা বলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
৩. আত্মসংযম ও তাকওয়া অর্জনে সহায়তা করে
নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়। বিশেষ করে রাগ, ক্ষোভ, অহংকার কিংবা কাউকে ছোট করে দেখানোর প্রবণতা থেকে অনেক সময় মানুষ অনাকাঙ্ক্ষিত কথা বলে ফেলে।
কথা বলার আগে তার পরিণতি বিবেচনা করার অভ্যাস আত্মসংযম বাড়ায়। একই সঙ্গে নিজের কাজ ও কথার জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে—এই উপলব্ধিও জাগ্রত রাখে।
ইসলামে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কথাবার্তায় সংযম সেই সচেতনতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
৪. ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক মর্যাদা বাড়ে
যে ব্যক্তি ভেবেচিন্তে কথা বলেন, অন্যের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেন এবং অযথা বিতর্কে জড়ান না, সাধারণত তাঁর প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ে।
অন্যদিকে, সব বিষয়ে মন্তব্য করা কিংবা অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অপ্রয়োজনীয় আলোচনা করা মানুষের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দিতে পারে।
সংযত কথাবার্তা মানুষকে ধৈর্যশীল ও দায়িত্বশীল হতে শেখায়। ফলে ব্যক্তিগত সম্পর্কের পাশাপাশি সামাজিক জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
৫. পরকালের মুক্তির পথে সহায়ক হয়
ইসলামে জিহ্বার হেফাজতকে পরকালের সফলতার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। মানুষের প্রতিটি কথা ও কাজের জন্য জবাবদিহির বিষয়টি স্মরণে রাখা জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে চুপ থেকেছে, সে নাজাত পেয়েছে।’ (জামে তিরমিজি)
এই বাণীর শিক্ষা হলো, অনর্থক ও ক্ষতিকর কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা মানুষের জন্য কল্যাণকর। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সব পরিস্থিতিতে চুপ থাকলেই মুক্তি নিশ্চিত। বরং কথা ও কাজে সংযম, সৎকর্ম এবং আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলাই একজন মুমিনের দায়িত্ব।
সব সময় চুপ থাকাই কি উত্তম?
ইসলামে নীরবতার গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু এর অর্থ অন্যায় দেখেও নীরব থাকা নয়। সত্য কথা বলা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং মানুষকে ভালো কাজের দিকে আহ্বান জানানোও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
তাই কখন কথা বলা প্রয়োজন আর কখন নীরব থাকা উচিত, তা বুঝে চলতে হবে। কারও অধিকার ক্ষুণ্ন হলে, নিরপরাধ কেউ অন্যায়ের শিকার হলে কিংবা সত্য প্রকাশ করা জরুরি হলে দায়িত্বশীলভাবে কথা বলা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কথা বলার সময় ভাষা, পরিবেশ ও পরিস্থিতির প্রতিও খেয়াল রাখা উচিত।
নীরবতা সব সময় দুর্বলতার লক্ষণ নয়; কখনো এটি ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিচয়। আবার সঠিক সময়ে সত্য কথা বলাও সাহস ও দায়িত্বশীলতার প্রকাশ।
ইসলামের শিক্ষা হলো, জিহ্বাকে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে নিজের কিংবা অন্যের ক্ষতি না হয়। তাই কথা বলার আগে চিন্তা করা, মিথ্যা ও পরনিন্দা থেকে দূরে থাকা এবং প্রয়োজনের সময় সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো—এসব গুণ নিজের জীবনে ধারণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
ধর্ম ও জীবন এর সর্বশেষ খবর