একদিকে সীমান্তঘেঁষা পাহাড়, সাদামাটির টিলা, পাহাড়ি নদী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি; অন্যদিকে দিগন্তজোড়া হাওর, বর্ষার অথৈ জলরাশি, শীতের অতিথি পাখি আর হেমন্তের সোনালি ধানখেত। প্রকৃতির এমন বিচিত্র সৌন্দর্য ছড়িয়ে রয়েছে নেত্রকোনার দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ও খালিয়াজুরী উপজেলায়। যথাযথ পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই তিন উপজেলাকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে জেলার অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যেতে পারে। সৃষ্টি হতে পারে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ, সম্প্রসারিত হতে পারে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য। তবে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও যোগাযোগসংকট, পর্যাপ্ত পর্যটনসুবিধার অভাব, অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও সরকারি উদ্যোগের ধীরগতিতে এখনো বিকশিত হয়নি এ অঞ্চলের পর্যটনশিল্প।
দুর্গাপুর: পাহাড়, নদী ও ঐতিহ্যের অপার সৌন্দর্য
দুর্গাপুরের প্রধান আকর্ষণ বিজয়পুরের সাদামাটির পাহাড়, গারো পাহাড়ের পাদদেশ, সোমেশ্বরী নদী, বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি, সুসং রাজবাড়ি, রানীখং মিশন, কমলা রানীর দিঘি ও হাজং মাতা রাশিমণির স্মৃতিসৌধ। বিশেষ করে বিজয়পুরের সাদামাটির রঙিন টিলা ও খননকাজে সৃষ্ট নীল পানির লেক পর্যটকদের কাছে অনন্য আকর্ষণ। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুরের গারো পাহাড় ও ঐতিহ্যবাহী বটতলা, রংধনু পর্যটন স্পট এবং পাহাড়ে ট্রেকিংয়ের সুযোগ দুর্গাপুরের পর্যটন আকর্ষণকে আরও বৈচিত্র্যময় করেছে। তবে এ অঞ্চলের পরিবেশ সংরক্ষণ বড় চ্যালেঞ্জ। সাদামাটি উত্তোলন, পাহাড়ের প্রাকৃতিক গঠন পরিবর্তন এবং সোমেশ্বরী নদীতে অপরিকল্পিত বালু-পাথর উত্তোলন পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ফলে পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি পাহাড়, নদী ও খনিজ এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা জরুরি।
কলমাকান্দা: চন্দ্রডিঙ্গা ও পাতলাবনে নতুন পর্যটন সম্ভাবনা
দুর্গাপুরের পাশের সীমান্তবর্তী উপজেলা কলমাকান্দাও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এ উপজেলার রংছাতি, লেংগুরা ও খারনৈ ইউনিয়নের পাহাড়ি জনপদ পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো অসাধারণ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। বিশেষ করে রংছাতি ইউনিয়নের পাঁচগাঁও গ্রামের চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড়, লেংগুরা টিলা, গারো পাহাড়ের দৃশ্য, পাতলা বন এবং ফুলবাড়ী এলাকার সাত শহীদের সমাধি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সাত শহীদের সমাধিকে যথাযথ সংরক্ষণ ও তথ্যসমৃদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পর্যটনের আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া পাঁচগাঁও চন্দ্রডিঙ্গা পর্যটনকেন্দ্রের জন্য নির্মিত রিসোর্সটি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকার বিষয়টি জেলা প্রশাসনের তথ্যে উঠে এসেছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার করে পর্যটকদের জন্য এটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
খালিয়াজুরী: হাওরের বুকে প্রকৃতির অপরূপ জলরাজ্য
নেত্রকোনার পূর্ব প্রান্তের হাওরবেষ্টিত উপজেলা খালিয়াজুরী যেন প্রকৃতির আরেক বিস্ময়। বর্ষায় চারদিকে অথৈ জলরাশি, নৌকার চলাচল আর দিগন্তজোড়া জলাভূমি; শুষ্ক মৌসুমে সেই হাওরেই জেগে ওঠে সবুজ ও সোনালি ধানের মাঠ। ধনু ও ধলাই নদী ছাড়াও কীর্তনখোলা, গোবিন্দডোবা, লক্ষ্মীপুর, উত্তরবন্ধ, খৈড়তলা, লেপসিয়া ও জগন্নাথপুর হাওর এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য জলাভূমি। বর্ষায় হাওরের বুক চিরে নৌভ্রমণ, সূর্যাস্ত ও জ্যোৎস্না উপভোগ, শীতকালে অতিথি পাখি দেখা এবং হেমন্তে কৃষিজীবনের বৈচিত্র্য পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে। হেমনগর কান্দায় ২৬ একর খাসজমিতে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা সরকারি প্রকাশনায় থাকলেও এর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি এখনো স্পষ্ট নয়। এছাড়া পাঁচহাট জামে মসজিদ ও চানপুর হাসার আখড়ার মতো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও খালিয়াজুরীর পর্যটন আকর্ষণ বাড়াতে পারে।
সম্ভাবনার বিপরীতে বড় বাধা
তিন উপজেলার পর্যটন বিকাশে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো যোগাযোগ ও পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব। দুর্গাপুরের দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সড়কের মান ও পরিবহনসুবিধার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কলমাকান্দার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করতে সড়ক ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। খালিয়াজুরীর সমস্যা আরও প্রকট; উপজেলার মোট সড়কের দৈর্ঘ্য ৪২৯ কিলোমিটার হলেও পাকা সড়ক মাত্র ৪ কিলোমিটার। ফলে নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয়, কিন্তু পর্যটকদের নিরাপদ নৌভ্রমণ, নির্দিষ্ট নৌরুট, ঘাট ও জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় বড় পরিসরে পর্যটন পরিচালনা কঠিন। এ ছাড়া পাহাড় কাটা, নদী থেকে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন ও প্লাস্টিক বর্জ্যের মতো পরিবেশগত ঝুঁকিগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
পর্যটন হতে পারে কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার
পরিকল্পিত পর্যটন চালু হলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব পড়বে। দুর্গাপুরে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও হস্তশিল্পের বাজার সম্প্রসারিত হতে পারে। কলমাকান্দায় পাহাড়কেন্দ্রিক পর্যটন এবং খালিয়াজুরীতে নৌযান পরিচালনা ও হাওরভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। ইতোমধ্যে দুর্গাপুরে পর্যটন হাব গড়ে তোলার বিষয়ে নতুন উদ্যোগের আভাস মিলেছে। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকারের উদ্যোগে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন দুর্গাপুর ও কলমাকান্দায় আধুনিক পর্যটন মডেল স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাইয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে তথ্য চেয়েছে। নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানিয়েছেন, পর্যটনমুখী এলাকাগুলোকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনতে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
প্রয়োজন তিন উপজেলার জন্য সমন্বিত মহাপরিকল্পনা
পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ও খালিয়াজুরীর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। দুর্গাপুরে প্রকৃতিনির্ভর ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন, কলমাকান্দায় পাহাড় ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত পর্যটন এবং খালিয়াজুরীতে হাওরের জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে ইকো-ট্যুরিজমের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ জন্য নিরাপদ যাতায়াত, নির্দিষ্ট নৌরুট, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পর্যটক তথ্যকেন্দ্র নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ, কার্যকর পরিকল্পনা ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই তিন উপজেলাকে পর্যটনের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর