ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে নির্বাচনে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাইরুল ইসলামকে অপসারণ এবং নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে দলটি।
রোববার (২৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের বৈঠক শেষে এসব কথা বলেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। এসময় দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ইসির পক্ষ থেকে সিইসি'র সঙ্গে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ ও ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদসহ উর্ধতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের পরিবেশ সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে নয়টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ লিখিতভাবে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগের পক্ষে ছবি ও অন্যান্য প্রমাণও কমিশনকে দেওয়া হয়েছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষ আচরণ দেখা যাচ্ছে না। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ দেওয়া হলেও সেগুলোর কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগ তদন্তের নামে দীর্ঘসূত্রতা করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
জামায়াতের এই নেতা অভিযোগ করেন, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ইউএনও খাইরুল ইসলাম একটি নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। ওই কর্মকর্তার সঙ্গে প্রার্থীর রাতের বৈঠক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অপসারণের দাবি জানান।
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রচারে রঙিন প্রতীক ব্যবহার, নির্ধারিত সময়ের আগে মাইক বাজানো, ধর্মীয় স্থানকে নির্বাচনী কাজে ব্যবহার এবং ভোটারদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব বিষয়ে কমিশনকে ছবি ও লিখিত তথ্য দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া নির্বাচনী এলাকায় হামলা, মারধর ও হুমকির অভিযোগ তুলে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, দলটির নেতাকর্মী, নারী এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের কেউ কেউ হামলা ও ভয়ভীতির শিকার হয়েছেন। এতে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনায় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বাড়ালেই নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত হবে না; দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতাও জরুরি। এ কারণে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচন কমিশন তাদের অভিযোগ শুনেছে এবং স্থানীয়ভাবে যোগাযোগ করে এখতিয়ার অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। তবে কমিশনের বক্তব্যে তারা পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেননি।
তিনি আরও বলেন, জামায়াত এখনো নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়নি। দলটির প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুত। তবে নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে নিতে হবে।
ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন নিয়ে জামায়াতের ৯ অভিযোগ-
১. রঙিন প্রতীক ব্যবহার করে নির্বাচনী আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করা হচ্ছে কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।
২. হিন্দু ভোটার ও সরকারি চাকরিজীবীদের হুমকি প্রদান করে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি ও ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা দেওয়ার হচ্ছে কিন্তু প্রশাসনের পক্ষথেকে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।
৩.নির্বাচনী বিধিমালায় দুপুর ২টার পর্যন্ত মাইক ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও এই সময়ের মধ্যে মাইক ব্যবহার করে প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
৪. নির্বাচনী বিধিমালায় ভোটারদের কোন সুবিধা দেয়া হয় এমন কোন কাজ করা নিষিদ্ধ থাকলেও মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে ভোটারদের সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।
৫. ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনী প্রচারণা নিষিদ্ধ থাকলেও ধানের শীষের পক্ষে মসজিদে সোফা সেট স্থাপন করে ধানের শীষের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
৬. ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ খায়রুল ইসলামের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করা এবং ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে প্রকাশ্যে ধানের শীষের পক্ষে অবস্থান নেয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে বারবার অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করার অভিযোগও রয়েছে, যা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
৭. ২২/১০/২০২৬ ঠাকুরগাঁও পৌরসভার আদর্শ স্কুলের সামনে ওই স্কুলের শিক্ষক আক্কাস আলী ৪ জন মহিলা জামায়াত কর্মীকে ভোটার গণসংযোগের সময় অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে হেনস্তা করেন। তিনি জামায়াতের প্রার্থীর ব্যাপারেও কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল কথাবার্তা বলেন।
৮.২৪/১০/২০২৬ পৌরসভার হাজীপাড়াস্থ আমানতুল্লাহ ইসলামী একাডেমির পার্শ্বে মহিলা জামায়াত কর্মী সায়মা আক্তারের বাড়িতে গিয়ে পার্শ্ববর্তী বিএনপি নেতা ফরহাদ হোসেন, পিতা: মৃত বজলার রহমান, তাকে বাড়ি থেকে নির্বাচনী কাজে বের না হতে হুমকি দেন। একই দিনে ভূল্লী উপজেলার বড়গাঁও ইউনিয়নে জামায়াতের ইউনিয়ন সেক্রেটারী মাসুদ রানার দোকানের সামনে ব্যারিকেড দেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সুলতান, বাবুল ও একজন ভ্যান চালকের উপর অতর্কিতভাবে হামলা করে আহত করেন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাদ্দাম, ইউনিয়ন সেক্রেটারী-মাহফুজ, তাঁতীদলের জেলা সভাপতি-আনোয়ার হোসেন (বাবুল মাস্টার), ইউনিয়ন সাংগঠনিক সম্পাদক-মামুন, ইউনিয়ন ছাত্রদলের-নাঈম। আহতরা সকলে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এছাড়াও সদর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের বেংরোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কুতপার হাট কেন্দ্রের পাশে জামায়াত কর্মীদের নির্বাচনী কাজে বাধা প্রদান করেন বিএনপি কর্মী মাজেদুর রহমান, পিতা: মৃত দফির উদ্দীন, যুবদল সভাপতি-মোফাজ্জল হোসেন, পিতা-আব্দুর রহিম, যুবদল নেতা আব্দুল হামিদ (সাবেক মেম্বার), সাজু-পিতা: ফজলু।
৯. রুহিয়া উপজেলার আখানগর ইউনিয়নের চতুরাখোর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র এলাকার জামায়াতের অসংখ্য ব্যানার কেটে নিয়েছেন জনি পারভেজ মেম্বার (প্যানেল চেয়ারম্যান)।
এ ছাড়া নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার স্বার্থে ৩ টি দাবিও জানিয়েছে দলটি। দাবিগুলো-
১. উল্লিখিত অভিযোগসমূহ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২. ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, ভোটকেন্দ্রে পুলিশের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে।
৩. সংশ্লিষ্ট ইউএনওর নিরপেক্ষতা যাচাইপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
রাজনীতি এর সর্বশেষ খবর