কক্সবাজারের সমুদ্র, নদী, জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গ নিয়ে যিনি নিয়মিত লিখেছেন ও অনুসন্ধান করেছেন, সেই সাংবাদিক আহমেদ গিয়াস আর নেই। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
আহমেদ গিয়াসের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার বড় ছেলে আহমেদ আবরার। তিনি জানান, কলেজে থাকাকালে খবর পান তার বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন। পরে তাকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
আহমেদ গিয়াসের গ্রামের বাড়ি কক্সবাজারের খুটাখালীতে। তবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে শহরের দরিয়ানগর এলাকায় একটি জরাজীর্ণ বাড়িতে বসবাস করতেন। সাংবাদিকতায় দীর্ঘ সময় কাটালেও তার ব্যক্তিজীবন ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের মতো করে অনুসন্ধান ও গবেষণার কাজ চালিয়ে গেছেন।
তিনি চট্টগ্রামের প্রাচীন সংবাদপত্র দৈনিক আজাদীর কক্সবাজারের স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর আগে তিনি দৈনিক কক্সবাজার, দৈনিক যায়যায়দিন ও দৈনিক ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সাংবাদিকতা করেছেন। তার সাংবাদিকতার পরিচয় শুধু সংবাদ সংগ্রহ কিংবা প্রচলিত প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ ছিল না; কক্সবাজারের প্রকৃতি, সমুদ্র ও জীববৈচিত্র্য ছিল তার আগ্রহ ও অনুসন্ধানের প্রধান ক্ষেত্র।
সাগরলতা, তিমি, লাল কাঁকড়া, বাঁকখালী নদী এবং সমুদ্রসৈকতের পরিবেশগত নানা বিষয় নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন করেছেন। এসব প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে তিনি কক্সবাজারের প্রকৃতি ও পরিবেশের অজানা দিকগুলো জনপরিসরে আলোচনায় এনেছেন। তার অনুসন্ধানী লেখালেখি কক্সবাজারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, পরিবেশ সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সাংবাদিকতা জীবনের একপর্যায়ে, বিশেষ করে ২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় পুলিশের হামলার শিকার হওয়ার ঘটনা তার জীবনে বড় প্রভাব ফেলেছিল। এরপর তিনি রাজনৈতিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সাংবাদিকতার চেয়ে সমুদ্র, নদী ও প্রকৃতি নিয়ে গবেষণাধর্মী সাংবাদিকতায় বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন। ব্যক্তিগত জীবনে অভাব-অনটনের মধ্যেও প্রকৃতি নিয়ে তার অনুসন্ধান থেমে থাকেনি।
এদিকে, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আহমেদ গিয়াসের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে কক্সবাজার রিপোর্টার্স ইউনিটি। সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ এক বিবৃতিতে বলেন, আহমেদ গিয়াস ছিলেন সৎ, সাহসী, নির্ভীক, নির্লোভ ও নিভৃতচারী সাংবাদিক। তার মৃত্যুতে কক্সবাজারের সাংবাদিকতা জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, সমুদ্রের বালুচর, সাগরলতা, সামুদ্রিক বর্জ্য, পাহাড়-পর্বত ও বন্যপ্রাণীর জীবনযাপন নিয়ে তার গবেষণাধর্মী প্রতিবেদনগুলো পাঠকমহলে ব্যাপক সমাদৃত ছিল। জীবনের পুরোটা সময় অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে কাটানো এই সাংবাদিক শহরের দরিয়ানগর এলাকায় একটি ছড়ার তীরে জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করতেন। এক বিদায়ী জেলা প্রশাসক তাকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেও সাংবাদিকদের একটি পক্ষের বিরোধিতায় সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
আহমেদ গিয়াস তিন পুত্রসন্তানের জনক ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, সন্তানসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। কক্সবাজার রিপোর্টার্স ইউনিটির নেতৃবৃন্দ মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।
স্বাধীন/সা.এ.
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর