ইরানে নতুন করে সীমিত সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে শুক্রবার এ হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, কেশম দ্বীপের সুজা এলাকায় দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত এই দ্বীপটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।
শনিবার (৭ নভেম্বর) প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প সামরিক অভিযানটিকে ‘ছোটখাটো’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ইরান নতুন করে একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র সেটি পাঁচ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে ধ্বংস করে দিয়েছে।
তবে হামলার লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলা এবং চলমান সংঘাতের শুরুর দিকে ইরানের অধিকাংশ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায় অথবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মার্কিন কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, ইরান সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে।
এর আগে সোমবারও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানে কথিত প্রতিরক্ষামূলক হামলা চালানোর কথা জানিয়েছিল। সে সময় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কেশম ও হেনগাম দ্বীপ এবং কাছাকাছি মূল ভূখণ্ডের বন্দর আব্বাস এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
এদিকে সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের বিরোধ নিরসনে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে কাতার। শুক্রবার মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশের কর্মকর্তার বরাতে এপি জানায়, কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মতপার্থক্য কমাতে নতুন কিছু প্রস্তাব দিয়েছে। ইরান সেগুলো পর্যালোচনা করছে।
তবে ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি মৌলিক শর্ত মেনে না নিলে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি নয় তেহরান।
ইরানের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশটির বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, জব্দ করা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানসহ পুরো অঞ্চলে শত্রুতা বন্ধ করা।
আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের বরাতে এপি জানিয়েছে, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার পথ তৈরি করতে ইরান ও মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে একটি সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী সমঝোতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
কাতারের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত প্রস্তাবে দুই দিনের মধ্যে আস্থা তৈরির কিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। প্রথম দিনে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার এবং জব্দ থাকা ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদের একটি অংশ ছাড়ের প্রস্তাব রয়েছে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলার শিকার ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
দ্বিতীয় দিনে ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেবে। এ ক্ষেত্রে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচিত একটি সংশোধিত সমঝোতা অনুসরণের কথা রয়েছে, যা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন পায়নি। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে পরবর্তী সময়ে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির অন্যান্য বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা শুরু হতে পারে।
ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা ৪৪০ দশমিক ৯ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে।
এদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে তথ্য পেতে সর্বোচ্চ ২ কোটি মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এ ঘোষণা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস’ কর্মসূচির আওতায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, সরঞ্জাম, বিজ্ঞানীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য দিলে এ পুরস্কার দেওয়া হবে। পাশাপাশি তথ্যদাতাকে সম্ভাব্য পুনর্বাসনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর শুক্রবারের হামলাকে ইরানে প্রথম নতুন সামরিক অভিযান হিসেবে উল্লেখ করেছে এপি। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ এবং জ্বালানির উচ্চমূল্য ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমনে উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন দেশের নেতাদের মধ্যে টেলিফোনে কূটনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে। শুক্রবার কাতারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শেখ সৌদ বিন আবদুর রহমান আল থানির সঙ্গে কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও চলমান সংঘাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়।
এর আগে কাতারের আমিরের সঙ্গেও ট্রাম্পের টেলিফোনে কথা হয়। আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা নিয়ে দুই নেতার আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে কাতার সরকার।
সব মিলিয়ে একদিকে ইরানে নতুন করে মার্কিন সামরিক হামলা, অন্যদিকে কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা—দুই বিপরীতমুখী তৎপরতায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর