একদিকে সাহিত্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক, অন্যদিকে সেই প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েই ফ্রান্সের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার জয়ী লেখকের স্বীকারোক্তি। নিজের উপন্যাসে চ্যাটজিপিটির তৈরি একটি বাক্য লুকিয়ে রেখেছিলেন ফরাসি লেখক ফিলিপ জেনাদা। পাঠকদের চ্যালেঞ্জও জানিয়েছিলেন, খুঁজে বের করতে হবে সেই বাক্য। শেষ পর্যন্ত নিজেই ফাঁস করলেন রহস্য। তাঁর এই স্বীকারোক্তি নতুন করে আলোচনায় এনেছে সাহিত্যচর্চায় এআইয়ের ভূমিকা ও লেখকের সৃজনশীলতার প্রশ্ন।
২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর নিজের উপন্যাস L’Inconnue du quai de Javel–এর জন্য প্রি গঁকুর (Prix Goncourt) পুরস্কার পান ৬২ বছর বয়সী ফিলিপ জেনাদা। পুরস্কার পাওয়ার পরদিন ফ্রান্সের রেডিও স্টেশন ফ্রান্স ইন্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, উপন্যাসটি লেখার সময় তিনবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়েছেন। তবে পুরো বই লেখার জন্য নয়, বরং গবেষণা, একটি প্রযুক্তিগত বিষয় যাচাই এবং পাঠকদের সঙ্গে মজার ছলে খেলার জন্য ব্যবহার করেছেন চ্যাটজিপিটি।
বইয়ের পাতায় লুকানো এআইয়ের বাক্য
জেনাদার সবচেয়ে মজার কাণ্ডটি ছিল উপন্যাসের মধ্যে চ্যাটজিপিটির তৈরি একটি বাক্য লুকিয়ে রাখা। পাঠকদের উদ্দেশে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন, বইয়ের কোন বাক্যটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লেখা, তা খুঁজে বের করতে হবে। তাঁর দাবি, এ নিয়ে পাঠকদের কাছ থেকে প্রায় ৭০টি উত্তর পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু একটিও সঠিক ছিল না।
৬ নভেম্বর ফরাসি সংবাদমাধ্যম আরটিএলের একটি অনুষ্ঠানে এসে সেই রহস্যের সমাধান করেন লেখক। তিনি জানান, উপন্যাসে প্রথমে লিখেছিলেন, ‘বিশ্বাস করলে ক্ষতি নেই’—এমন অর্থের একটি প্রচলিত ফরাসি বাক্য। এরপর সেটিকে আরেকটি প্রচলিত কথার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। নিজে উপযুক্ত বাক্য খুঁজে না পেয়ে চ্যাটজিপিটির সাহায্য নেন।
চ্যাটজিপিটি তাঁকে যে বাক্যটি দিয়েছিল, তার অর্থ দাঁড়ায়, ‘বিশ্বাস করলে ক্ষতি নেই, কিন্তু তাতে টেবিলে খাবারও আসে না।’ বাক্যটি পছন্দ হওয়ায় সেটি উপন্যাসে রেখে দেন জেনাদা। তাঁর কাছে বিষয়টি ছিল পাঠকদের সঙ্গে একধরনের সাহিত্যিক রসিকতা।
তিনবার এআইয়ের সাহায্য নিয়েছিলেন লেখক
জেনাদা জানিয়েছেন, উপন্যাস লেখার সময় তিনটি পৃথক কাজে এআই ব্যবহার করেছেন।
- প্রথমবার: পাঠকদের চমকে দিতে উপন্যাসে চ্যাটজিপিটির তৈরি একটি বাক্য যুক্ত করেন।
- দ্বিতীয়বার: একটি কারিগরি বিষয়ে চ্যাটজিপিটির অদ্ভুত ও হাস্যকর উত্তর পান। সেই উত্তরকে ব্যঙ্গ করার জন্য উপন্যাসে সেটি ব্যবহার করেন।
- তৃতীয়বার: উপন্যাসের গবেষণার কাজে প্রযুক্তিটির সহায়তা নেন।
তবে এআই দিয়ে উপন্যাসের মূল লেখা তৈরি করার অভিযোগ তিনি স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বরং প্রযুক্তিকে চিনতে হবে, কাজে লাগাতে হবে এবং এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে মানুষ নিজেই তার জায়গা হারিয়ে না ফেলে।
একই পুরস্কার ঘিরে দ্বিমুখী আচরণের প্রশ্ন
জেনাদার স্বীকারোক্তি সামনে আসার পর সাহিত্যজগতে এআই ব্যবহারের নীতিমালা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারণ, এর কিছুদিন আগেই কানাডীয়-হাইতিয়ান লেখক থেলিসন ওরেলিয়েনের উপন্যাস C’était ça ou mourir এআই ব্যবহারের অভিযোগে গঁকুর পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকা থেকে বাদ পড়ে।
ওরেলিয়েনের ঘটনা এবং জেনাদার স্বীকারোক্তি পাশাপাশি আসায় প্রশ্ন উঠেছে, সাহিত্যে এআই ব্যবহারের গ্রহণযোগ্যতার সীমা কোথায়? একজন লেখকের ক্ষেত্রে সীমিত ও পরীক্ষামূলক ব্যবহারকে সৃজনশীলতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে আরেকজনের ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠতেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে দুই ঘটনার প্রেক্ষাপট ও এআই ব্যবহারের ধরন এক নয়—এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
সাহিত্যের ভবিষ্যৎ কি বদলে দিচ্ছে এআই?
লেখালেখিতে প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন নয়। তথ্য অনুসন্ধান, অনুবাদ, সম্পাদনা কিংবা ভাবনা সাজানোর কাজে লেখকেরা দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছেন। তবে জেনাদার ঘটনা নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—এআইয়ের তৈরি একটি বাক্য যখন পুরস্কারজয়ী উপন্যাসের অংশ হয়ে ওঠে, তখন সেই সৃষ্টির কৃতিত্ব কার?
একদল মনে করেন, লেখকের নির্দেশনা ও সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকলে এআই হতে পারে সহায়ক হাতিয়ার। অন্যদের আশঙ্কা, এর অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের নিজস্ব ভাষা, চিন্তা ও কল্পনাশক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে।
জেনাদার অবস্থান অবশ্য পরিষ্কার। প্রযুক্তিকে অস্বীকার নয়, বরং বুঝেশুনে ব্যবহার করতে হবে। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সাহিত্যজগতে নতুন এক বাস্তবতা সামনে এসেছে—এআই হয়তো লেখকের বিকল্প নয়, কিন্তু লেখালেখির জগতে তার উপস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ারও উপায় নেই।
সূত্র: গার্ডিয়ান
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর