সরকারি বাসা বরাদ্দ নিয়ে অনিয়ম বন্ধে এবার মাঠে নামছে সরকারি আবাসন পরিদপ্তর। ৩১ অক্টোবরের মধ্যে সরকারি আবাসনে থাকা সাবলেট ও ভাড়াটেদের বাসা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও এখনো যেসব বাসায় ভাড়াটে বা সাবলেট রয়েছেন, সেগুলোতে অভিযান চালানো হবে। সংশ্লিষ্ট সরকারি চাকরিজীবীদের চিহ্নিত করে নেওয়া হতে পারে পরবর্তী ব্যবস্থা। এমনকি বাতিল হতে পারে তাঁদের বাসার বরাদ্দও।
তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট চাকরিজীবীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হবে। ভাড়াটে বা সাবলেট কেন এখনো বাসা ছাড়েননি, তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে হবে তাঁদের। সন্তোষজনক কারণ দেখাতে না পারলে বাংলাদেশ বরাদ্দ বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে সরকারি আবাসন পরিদপ্তর।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সবাই বাসা ছেড়েছেন কি না, তা যাচাই করতে পরিদপ্তরের তদন্ত দল ইতিমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি আবাসিক এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শন শুরু করেছে। কারা বাসা ছেড়েছেন, আর কারা এখনো ছাড়েননি—তা নিয়ে তৈরি করা হচ্ছে তালিকা। এ জন্য পাঁচটি তদন্ত দল ঢাকার বিভিন্ন সরকারি আবাসনে কাজ করছে। এরই মধ্যে কয়েকটি এলাকার তথ্য পাওয়া গেলেও পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ এখনো শেষ হয়নি।
আবাসন পরিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির পর অভিযান শুরু হবে। যেসব সরকারি চাকরিজীবীর বরাদ্দ করা বাসায় এখনো সাবলেট বা ভাড়াটে রয়েছেন, মূলত সেসব বাসায় অভিযান চালানো হবে।
পরিদপ্তরের পরিচালক জহিরুল ইসলাম খান বলেন, নোটিশ দেওয়ার পর অনেকে বাসা ছেড়ে দিয়েছেন। তবে এখনো অনেকে বাসা ছাড়েননি বলেও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ তালিকা হাতে পাওয়ার পর অভিযান পরিচালনা করা হবে। যেসব বাসা থেকে সাবলেট বা ভাড়াটে সরেননি, সেসব বাসার বরাদ্দপ্রাপ্তদের কাছে এর কারণ জানতে চাওয়া হবে। এরপর বাংলাদেশ বরাদ্দ বিধিমালা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ২৭টি এলাকায় সরকারি আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। এলাকাগুলো হলো—বেইলি রোড, সার্কিট হাউস রোড, ইস্কাটন, গুলশান, বনানী, উত্তরা, ধানমন্ডি, জিগাতলা, রায়েরবাজার, মোহাম্মদপুর, এলিফ্যান্ট রোড, গ্রিন রোড, সোবহানবাগ, আজিমপুর, পলাশী, এলেনবাড়ি, তেজগাঁও লাভ রোড, মালিবাগ, শাহজাহানপুর, খিলগাঁও-সবুজবাগ, মতিঝিল, টিকাটুলি, মিরপুর-১-এর পাইকপাড়া, মিরপুর-৬-এর শিয়ালবাড়ি, মিরপুর-১০-এর ন্যাম গার্ডেন, শেরেবাংলা নগর ও আগারগাঁও।
এসব এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সরকারি ফ্ল্যাট রয়েছে আজিমপুরে। সেখানে ফ্ল্যাটের সংখ্যা ৩ হাজার ৪০৪টি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মিরপুরের পাইকপাড়া, যেখানে রয়েছে ১ হাজার ৭৩০টি ফ্ল্যাট। এ ছাড়া মিরপুর-১-এর শিয়ালবাড়িতে ১ হাজার ৯১টি এবং মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে রয়েছে ১ হাজার ১১২টি ফ্ল্যাট।
রাজধানীতে সরকারি আবাসন বরাদ্দ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অনেক সরকারি চাকরিজীবী বরাদ্দ পাওয়া বাসায় নিজে না থেকে অন্যদের কাছে সাবলেট বা ভাড়া দিয়ে আসছেন। এমন পরিস্থিতিতে গত ২৯ অক্টোবর গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে সরকারি আবাসন পরিদপ্তর। এতে ৩১ অক্টোবরের মধ্যে সরকারি বাসায় থাকা সব সাবলেট ও ভাড়াটেকে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বরাদ্দপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীকে নিজ বাসায় বসবাসের নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের পর কোনো সরকারি ফ্ল্যাটে সাবলেট বা ভাড়াটে পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট চাকরিজীবীর বরাদ্দ বাতিলের কথাও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
নোটিশ জারির পর আজিমপুর সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীসহ অনেক ভাড়াটেকে দ্রুত বাসা ছেড়ে যেতে দেখা যায়। মাত্র এক দিনের নোটিশে বাসা ছাড়ার নির্দেশনায় বিপাকে পড়েন অনেকে। এ নিয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করেন তাঁরা। তাঁদের কেউ কেউ অন্তত এক মাস সময় দেওয়ার দাবি জানান।
নোটিশের পর কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, তাঁরা মৌখিক চুক্তিতে বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী, বাসা ছাড়তে হলে অন্তত দুই মাস আগে জানানোর কথা ছিল। কিন্তু সেই শর্ত না মেনে হঠাৎ এক দিনের মধ্যে বাসা ছাড়তে বলায় তাঁরা কোথায় যাবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন।
সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানীতে বিভিন্ন শ্রেণির মোট ১৯ হাজার ৯১টি সরকারি বাসা রয়েছে। এর মধ্যে সচিবদের জন্য রয়েছে ১১৪টি সচিব নিবাস ও ৭৯টি বাংলো।
গ্রেড-৩ বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের জন্য রয়েছে ৫৫৮টি সুপিরিয়র শ্রেণির বাসা। গ্রেড-৫ বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের জন্য ১ হাজার ৮৯৯টি, গ্রেড-৬ বা তদূর্ধ্বদের জন্য ১ হাজার ৮৯০টি, গ্রেড-৭ থেকে ৯-এর জন্য ২ হাজার ৬৩২টি এবং গ্রেড-১০ থেকে ১২-এর জন্য রয়েছে ৪ হাজার ৮৯০টি বাসা। এ ছাড়া শুধু গ্রেড-৯ কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে ৭৭৫টি ফ্ল্যাট।
অন্যদিকে, ১২ ও ১৩তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ১ হাজার ৮৪টি, ১৪ ও ১৫তম গ্রেডের জন্য ১ হাজার ৫৭৪টি, ১৬ ও ১৭তম গ্রেডের জন্য ২ হাজার ৫১৩টি এবং ১৮ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য রয়েছে ২ হাজার ৬১টি ফ্ল্যাট।
স্বাধীন/সা.এ.
সর্বশেষ খবর