মুখের লালায় যক্ষ্মা প্রতিরোধক অ্যান্টিবায়োটিক বিনষ্টকারী রেজিস্ট্যান্স জিন শনাক্ত

   
প্রকাশিত: ৯:১৩ পূর্বাহ্ণ, ২৯ নভেম্বর ২০২০

কামরুল হাসান অভি, রাবি থেকে: সুস্থ মানুষের মুখের লালায় যক্ষ্মা চিকিৎসায় ব্যবহৃত ডি-সাইক্লোসেরিন নামক একটি শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতাকে নষ্ট করে দিতে পারে এমন একটি জিনের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ‘ডি-অ্যালানিন-ডি-অ্যালানিন লাইগেজ’ নামে এই জিনটি প্রথমবারের মতো ‘ইন্টেগ্রন জিন ক্যাসেট’ নামক এক ধরনের ক্ষুদ্র ভ্রাম্যমাণ জেনেটিক উপাদানের মধ্যে শনাক্ত হয়। বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দুটি পৃথক নমুনা সেটের প্রায় সকল সুস্থ স্বেচ্ছাসেবকের লালায় এই ভ্রাম্যমাণ জিনের সন্ধান পেয়েছেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন, কিংস কলেজ লন্ডন ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক।

জিনটির দুটি আইসোফর্ম শনাক্ত হয়েছে যার একটি আরেকটির তুলনায় চারগুণ শক্তিশালী। দাঁতের ক্ষয় রোগের জন্য দায়ী ট্রেপোনেমা ডেন্টিকোলা নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া এ জিনটি বহন করছে বলে প্রমাণ পেয়েছেন তারা। জিনটির সামান্য জেনেটিক পরিবর্তন হলে এর পোষক ব্যাকটেরিয়া ভ্যানকোমাইসিন নামক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতাকে নষ্ট করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। গত বৃহস্পতিবারে প্রকাশনা সংস্থা নেইচার রিসার্চ কর্তৃক প্রকাশিত ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ জার্নালে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের মাইক্রোবিয়াল ডিজিজেস বিভাগে প্রায় তিন বছর আগে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে ড. অ্যাডাম রবার্টস ও অধ্যাপক পিটার মুলানীর তত্ত্বাবধানে এ গবেষণাটির মূল কাজ সম্পন্ন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান। তার পিএইচডি গবেষণার অংশ হিসেবে এ গবেষণা প্রকল্পটি সম্পন্ন হয়। কিংস কলেজ লন্ডনের ড. খন্দকার মিরাজ রহমানের ল্যাবে গবেষণাটির একটি অংশ সম্পাদিত হয়।

গবেষণালব্ধ ফলাফলটি কি কাজে লাগবে জানতে চাইলে ড. আজিজুর বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স মোকাবেলা করতে হলে ব্যাকটেরিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ক্ষমতার জন্য যে জিনগুলো দায়ী, তার উৎস খুঁজে বের করা খুব জরুরি। কারণ, অধিকাংশ রোগ সৃষ্টকারী ব্যাকটেরিয়া শুরুর দিকে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ছিল না।

অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার ও অপব্যবহারের কারণে এক সময়ের অ্যান্টিবায়োটিক সংবেদনশীল ব্যাকটেরিয়া নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় জেনেটিক মিউটেশন (জিনের গঠনগত পরিবর্তন) অথবা অন্য অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার ভ্রাম্যমাণ রেজিস্ট্যান্স জিন সংগ্রহ করে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। জেনেটিক মিউটেশন বা ভ্রাম্যমাণ রেজিস্ট্যান্স জিন সংগ্রহ করে কি কি কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে একসময়ের অ্যান্টিবায়োটিক সংবেদনশীল ব্যাকটেরিয়াগুলো অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠলো তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে এবং বিজ্ঞানীরা এ সকল কৌশলকে টার্গেট করে বেশ কিছু সফল অ্যান্টিবায়োটিক আবিস্কার করতে সক্ষম হয়েছেন।

ড. আজিজুর রহমান বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াগুলোতে ভ্রাম্যমাণ রেজিস্ট্যান্স জিনের প্রাথমিক উৎস কি তা পরিষ্কার ছিল না। আমি আমার গবেষণায় দেখিয়েছি যে, সুস্থ মানুষের মুখগহ্বরে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়াও রেজিস্ট্যান্স জিনের বাহক হতে পারে। আমি সুস্থ মানুষের লালায় যে জিনটি শনাক্ত করেছি তা ভ্রাম্যমাণ হওয়ায় সেটি খুব সহজেই যক্ষ্মাসহ অন্য রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিন মাস ধরে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ না করলেও প্রায় সকল স্বেচ্ছাসে এ জিনের সন্ধান পাওয়া বিস্ময়কর।

এই গবেষক মনে করেন, দুই দেশের (বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য) কমন খাদ্য উপাদান যেগুলোর জীবাণু প্রতিরোধী ক্ষমতা রয়েছে, সে রকম উপাদানকে মোকাবেলা করার জন্য সম্ভবত মুখগহ্বরের কিছু ব্যাকটেরিয়া এ জিনটিকে কাজে লাগাচ্ছে। আমাদের গবেষণার ফল অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উদ্ভব হওয়ার পিছনে খাদ্য উপাদানের ভূমিকা নিয়ে নতুন গবেষণার দুয়ার উন্মুক্ত করলো।

এআইআ/এইচি

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: