বহুরূপী ডিজে নেহার পরিবার, বাবা-মায়ের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন
প্রকাশিত: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৪:৩৬ পিএম
উপরের ছবিটি নেহার মা ‘ফারহানা মজুমদারের’ (বাঁয়ে), ডানে তার ভোটার আইডিসহ অন্য ডকুমেন্টের অংশ বিশেষ। ছবি: আরটিভি নিউজ
ঢাকার মিরপুরের বর্তমান বাসার ভাড়াটিয়া তথ্য নিবন্ধন ফরমে পরিবার সদস্যদের ঘরে নেহার মা প্রথমে স্বামীর নাম উল্লেখ করেন। এর পরেই প্রথম মেয়ে ‘ফারজানা হক’ এবং দ্বিতীয় মেয়ে হিসেবে ‘আনিকা হক’ এর নাম উল্লেখ করেন।
জটিলতা এখানেই যে, পুলিশ বলছে নেহার পুরো নাম ‘ফারজানা জামান নেহা’। অন্যদিকে নেহার মায়ের লেখা প্রমাণ বলছে নেহার নাম ‘ফরজানা হক’!
এই প্রতিবেদনটি পুরোপুরি মনোযোগ দিয়ে পড়লেই এসব জটিলতার জট খুলবে বলে আশা করা যায়।
নেহার প্রকৃত বাবা কে?
সরেজমিনে পাওয়া নেহার মায়ের লিখিত ডকুমেন্ট বলছে, নেহার বাবার নাম ‘মোজাম্মেল হক’। অনুসন্ধান বলছে, মোজাম্মেল হক আসলে নেহার বাবা বা তার মায়ের বিয়ে করা স্বামী নয়। এই ব্যক্তি চট্টগ্রামে থাকেন, মাঝে মাঝে নেহাদের বাসায় আসেন এবং কয়েকদিন আদর-আপ্যায়ন নিয়ে ফের চট্টগ্রামে চলে যান। নেহাদের বর্তমান বাসাটি তিনিই ভাড়া করে দেন, ওই বাসা ভাড়া নেওয়ার সময়ে বাড়িওয়ালা এবং নিরাপত্তা কর্মীর কাছে নেহার মাকে স্ত্রী বলে পরিচয় করিয়ে দেন। সে হিসেবে তিনি নেহার বাবা পরিচয়ে বাসাটি ভাড়া নেন। একই সময়ে নেহার মাও মোজাম্মেল হককে নিজের স্বামী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। ওই সময়ে নেহার মা জানান যে, তার স্বামী চট্টগ্রামে ইনকাম টেক্স নিয়ে কাজ করা একজন অ্যাডভোকেট। বস্তুত এটিই হলো পিলে চমকে ওঠার মতো ঘটনা। অনুসন্ধান বলছে, দীর্ঘদিন যাবত নেহার মায়ের সঙ্গে এই ব্যক্তির অবৈধ সম্পর্ক চলমান রয়েছে।
এদিকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তথ্য পেয়েছে, নেহার জন্মদাতা বাবা মি. জামান রাজধানীর আজিমপুরে থাকেন এবং পুরান ঢাকায় ব্যবসা করছেন। তার সঙ্গে নেহার মায়ের দূরত্ব চলছে দীর্ঘদিন যাবত।
নেহা বিপথে যাওয়ার পেছনে পরিবারের যে ভূমিকা:
খুব সাধারণ ‘নেহা’ থেকে ‘ডিজে নেহা’ ওরফে ‘কুইন নেহা’ হয়ে ওঠার পেছনের ঘটনা খুঁজতে সরেজমিনে অনুসন্ধান চালিয়েছে আরটিভি নিউজ। এক পর্যায়ে কথা হয় নেহার বড় খালা শাহানাজ পারভীনের সঙ্গে। যিনি যশোর শিক্ষা বোর্ডে চাকরিরত আছেন। তিনি আরটিভি নিউজকে বলেন, নেহাকে আমি কোলে পিঠে করে বড় করেছি। ছোট বেলা থেকেই নেহা খুবই সহজ সরল প্রকৃতির মেয়ে। তাকে ফাঁসানো হচ্ছে, এর পেছনে কোন পুরুষ মানুষতো অবশ্যই জড়িত আছে। বাচ্চা মানুষতো একটা ভুল করতেই পারে। নেহার এমন পথে পা বাড়ানোর পেছনে দায়িত্বের ক্ষেত্রে মায়ের কোনো অবহেলা ছিলো না, তবে বাবার অবহেলা আছে। বাবা খুব টর্চার করতো মেয়েটাকে। আমার বোনের মেয়েটা স্পষ্টবাদী, কোনো ছেলেকে হয়তো পাত্তা দেয় না, তাই শত্রুতা করে এমনটা করেছে। মেয়েটা ছোটবেলা থেকে আঘাত পেতে পেতে এমন হয়ে গেছে যে, মেয়ে কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলে না। যা বলে সামনা সামনেই বলে বসে। মেয়ের ফুফুরাও তাকে মাথার মধ্যে জোরে জোরে আঘাত করতো, মারধর করতো।
আরটিভি নিউজের সঙ্গে কথা বলার সময়ে খুবই আবেগী হয়ে পড়েন নেহার খালা শাহানাজ পারভীন। কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আসলে মেয়েটার কোনো দোষ নেই। বাবার অবহেলা আর অবজ্ঞার কারণেই পুরুষবিহীন সংসার ছিলো আমার বোনের। পরিস্থিতিতে মেয়েটা এমন হয়ে যায়। নেহা গ্রেপ্তার হওয়ার পর আমার বোন খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আমার বোনটাও জটিল রোগে আক্রান্ত। তারা আসলেই খুব সমস্যার মধ্যে আছে। পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে তারা যেখানেই গিয়েছে সেখানেই লাঠি ঝাটা খেয়েছে! তাদের ভাগ্যটাই খারাপ।
নেহার খালা আরও বলেন, অভাব অনটনের কারণে নেহার ছোট বোন আনিকা আমার কাছেই বড় হয়েছে। তাকে আমি বড় করেছি। সে এখনও পড়াশোনা করছে। গত ডিসেম্বরে নতুন বাসায় ওঠার পর আনিকা আমার কাছ থেকে তার মায়ের কাছে চলে যায়। যেহেতু আমার একমাত্র ছেলে বিয়ের পর তাকে মোটেও সহ্য করতে পারছিলো না। তাই আনিকাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছি। এদিকে আমিও অসুস্থ হয়ে পড়েছি।
খালাতো ভাই বিশাল বিভ্রাট:
নেহার খালাতো ভাই পরিচয় দেওয়া শাফায়াত জামিল বিশাল মূলত তাদের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় নয় বলে জানান নেহার খালা। তিনি বলেন, নেহারা আগে যে বাসায় ভাড়া থাকতো ওই বাসার এক মহিলাকে ধর্মের বোন ডেকেছে আমার বোন। সে থেকেই নেহা ও বিশাল খালাতো ভাইবোন পরিচয়ে একসঙ্গে চলাফেরা করতো, ঘুরে বেড়াতো। বিশাল উশৃঙ্খল প্রকৃতির ছেলে। আমাদের সন্দেহ হচ্ছে- বিশালের হাত ধরেই নেহা এমন পথে পা বাড়ায়। বিশালের মা খুবই খারাপ প্রকৃতির মহিলা। জানতে পেরেছি, বিশালের মা সম্প্রতি পঞ্চম বিয়ে করেছেন এক ব্যবসায়ীকে। এই মহিলা একের পর এক টাকাওয়ালাদের বিয়ে করে ব্লাকমেইলিংয়ের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়, অবশেষে মোটা দাগে ধার্য করা কাবিনের টাকাও। এখন ছেলে বিশালসহ বিদেশে পাড়ি জমানো ধান্দায় আছে সে।
বোন জানে না বোনের স্বামী কে!
নেহার মা ফারহানা মজুমদারের বড় বোন শাহনাজ পারভীনকে তার বোনের স্বামীর নাম পরিচয় জানেন না! বোনের স্বামীর নাম জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে বর্তমান বাসার ভাড়াটিয় তথ্য নিবন্ধন ফরমে স্বামী হিসেবে উল্লেখ থাকা ‘মোজাম্মেল হক’ এর বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে জানতে চাইলে তিনি বিব্রত হয়ে বলেন, ‘আমিতো যশোরে থাকি। তার বিষয়ে তো বলতে পারছি না। এটা সেই বলতে পারবে, আমি তো ওর বাসায় যাই না। আমি একটা কথাই বলছি- একটা পরিবারে পুরুষ গার্ডিয়ান না থাকলে যা হয়, তা আপনারাই ভালো জানেন। এ বিষয়ে আমার বলার কিছু নেই, আপনারাই বুঝে নেন। পারলে ওদের কাছেই শুনে নেন।’
নেহা ও তার মায়ের পরিচয় বিভ্রান্তি:
ডিজে নেহাদের আগের বাসার ঠিকানা- পশ্চিম মনিপুর, মিরপুর-২ এর একটি বাসার ৪র্থ তলা। ২০১৯ সালের যখন ওই বাসাটিতে ভাড়া ওঠেন নেহার মা ফারহানা মজুমদার, তখন ওই ভবনের লোকদের কাছে তিনি নেহাকে বোনের মেয়ে বলে পরিচয় দিয়ে বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন, অর্থাৎ তিনি নিজেকে নেহার খালা পরিচয় দিতেন। ওই বাসায় প্রায়ই বোরখা পড়া এক মহিলা আসতো, যাকে নেহার মা পরিচয় দেওয়া হতো। বলা হতো, পারিবারিক জটিলতার কারনে নেহার খালার বাসাতেই থাকছেন। এমন পরিস্থিতিতে তাদের পারিবারিক রিকশা চালক সুমনও বিভ্রান্তিতে পড়ে যেতো। তবে এ নিয়ে ওই রিকশা চালক মুখ খুলতে চাননি।
নেহার মায়ের জাতীয় পরিচয় পত্রের বয়স নিয়ে সন্দেহ:
নেহার মা ফারহানা মজুমদারের জাতীয় পরিচয়পত্রে তার নিজের বয়স উল্লেখ রয়েছে তিনি ১৯৮৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জন্ম গ্রহণ করেছেন। সে হিসেবে আজ পর্যন্ত ওনার বয়স ৩১ বছর ৪ মাস ৮ দিন চলছে। অন্যদিকে মামলার এজহারে নেহার বয়স আনুমানিক ২৫ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে মেয়ের সাথে মায়ের বয়স মাত্র ৬ বছর পার্থক্য। এরমধ্যে নেহার ছোট একটি বোনও রয়েছে। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, মাত্র ৬ বছর বয়সে কেমন করে তিনি সন্তান জন্মদান করলেন? এর প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টরা মনের করছেন তিনি হয় বয়স লুকিয়েছেন, অন্যথায় ভাড়াটিয়া তথ্য ফরমে যে ভোটার আইডি’র ফটোকপি যুক্ত করেছেন, তা ভুয়া বা জাল।
পুলিশের বক্তব্য:
আজ সোমবার (৮ ফেব্রুয়ারি) সংশ্লিষ্ট মামলার হালনাগাদ তথ্য জানতে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সাজেদুল হককে কল দেওয়া হলে তিনি আরটিভি নিউজকে বলেন, এই মামলার বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। যা বলবেন স্যাররাই বলবেন।
এরপর সন্ধ্যা ৬ টা ১১ মিনিটে কল দেওয়া হয় তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশীদকে। তবে তিনি ফোন কল রিসিভ করেননি।
উল্লেখ্য, এই মামলায় আসামি নেহা বর্তমানে রিমান্ডে রয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার (৯ ফেব্রুয়ারি) তার পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষ হবে। এরপরই তাকে আদালতে হাজির করবে পুলিশ। সূত্র: আরটিভি নিউজ।
বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
BD24Live.com © ২০২২ | নিবন্ধন নং- ৩২ - Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬৭৮৬৭৭১৯১
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬৭৮৬৭৭১৯০
মার্কেটিং ও সেলসঃ ০৯৬১১১২০৬১২
ইমেইলঃ [email protected]





পাঠকের মন্তব্য: