প্রচ্ছদ / খোলা কলাম / বিস্তারিত

মফস্বল সাংবাদিকতা: প্রতিবন্ধকতা ও আমরা

   
প্রকাশিত: ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ, ৮ জুন ২০২১

দিলওয়ার খান: সাংবাদিকতা পেশা এমনিতেই চ্যালেঞ্জের, তার ওপর আবার মফস্বল সাংবাদিকতা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয় সাংবাদিকতায়। বিভিন্ন প্রকার হুমকি, মামলা-হামলার শিকার হতে হয় যে পেশায় সেটাই হলো মফস্বল সাংবাদিকতা। একটা সংবাদ তৈরি করতে হলে ছুটতে হয় একেবারে তৃণমূলে। অনেক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয় মফস্বল সাংবাদিকদের। দুর্নীতি, অনিয়মের সংবাদ তৈরি করতে হুমকি বা হামলা হয়। জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন বা ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে সংবাদ হলেই অবস্থা কিছুটা অন্যরকম হয়। মফস্বল এলাকায় সাংবাদিকদের তেমন নিরাপত্তা দেওয়ারও কেউ থাকে না।

আজ আমি নেত্রকোণা সাংবাদিকদের কথায় বলছি। প্রায় তিনদশকের বেশি সাংবাদিকতার অভিজ্ঞাতার আলোকে আজ লিখছি মফস্বল সাংবাদিকতার ইতিকতা। দূর্ণীতিবাজ আমলা ও রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে ও সত্যেরে পক্ষে কলম ধরতে গেলেই চলে আমাদের উপর অত্যাচারের স্ট্রীমরোলার। কখনো প্রত্যক্ষ্য আবার বা কখনো পরোক্ষভাবে শিকার হতে হয় তাদের রক্তচক্ষুর চাহনির। কখনো মিথ্যা মামলা, কখনো শারীরীক নির্যাতন আবার বা কখনো হুমকি ধমকির মাধ্যমে স্তব্ধ করে দিতে চায় আমাদের ক্ষুরদার কলমের পথচলা। কেবল যে ঢালাওভাবে তাদেরকেই দায়ী করব, তা কিন্তু নয়। তাদের সাথে আমাদের একশ্রেণির স্বার্থবাজ সাংবাদিকদেরও কখনো ইন্ধন থাকে।

এমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল সেদিন নেত্রকোণায়। নেত্রকোনা আনসার অফিসের তিনদশক পূর্বে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি বিষয়ে লিখতে গিয়ে একটি মিথ্যা মামলা দিয়ে কলম সৈনিককে স্তব্ধ করে দেয়ার এক চাঞ্চল্যকর ঘৃণ্য অপচেষ্টা করা হয়েছিল। ১৯৯১ সালের ১লা নভেম্বর “নেত্রকোনা আনসার অফিসে ভূয়া লোক দেখিয়ে লাখ লাখ টাকার রেশন সামগ্রী আত্মসাৎ” শিরোনামে একটি সংবাদ পরিবেশন করেছিল দৈনিক আল আমিন পত্রিকার নিজস্ব সংবাদদাতা তরিকুল ইসলাম রাজা মিয়া।

এ দূর্নীতিকে পাশ কাটাতে সংশ্লিষ্ট অফিস পরিকল্পিতভাবে অফিস সহকারি টাঙ্গাইল জেলার সখীপুর উপজেলার কালিয়ান গ্রামের
হেলাল উদ্দিন নামের একজনকে বাদী করে একটি মামলা করে। অভিযোগ ছিল এই হেলালের ছেলে শামীম আল মামুন ওরফে রোকনকে আপহরন করা হয়েছে মর্মে তাদের অফিসের ৪জন আনসারকে আসামী করে একটি মামলা করে। এই মামলার খবর প্রকাশের দায়ে সাংকাদিক তরিকুল ইসলাম রজাসহ অপরাপর ৮ জনকে ১৬৪ ধারায় অপহরণসহ হত্যা মামলায় সম্পৃক্ত করা হয়। ইতিমধ্যে সিআইডি পুলিশ সাংবাদিক রাজাসহ ৮ জনের নামে অভিযোগ পত্র দায়ের করে।

কিন্তু পরবর্তীতে টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী থানার জনগন ১৪ মাস পর হেলালের অপহৃত ছেলে শামীম আল মামুন ওরফে রোকনকে জীবিত উদ্ধার করে পুলিশে সোপর্দ করে। অত্র মামলায় সাংবাদিক রাজাকে শারিরীক ও আর্থিকভাবে নিঃস্ব করে দিয়েছে। ১৩৩ দিন কারাগার বরণের পর অবশেষে ১৯৯২ সালে হাইকোর্ট থেকে ছাড়া পায়।

সম্প্রতি কথিত অপহৃত রোকন ও তার পিতা বাদী হেলাল উদ্দিন পর্যায়ক্রমে ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা দায়রাজজ আদালতে তরিকুল ইসলাম রাজা মিয়াকে দেখে নাই ও চেনে নাই বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করে ও সাক্ষিকালে বিজ্ঞ আদালতকে জানায় রাজার বিরোদ্ধে তাদের কোন অভিযোগ নেই। হাইকোর্ট রিভিশান মামলার ১৮ বছর পর হত্যা মামলা হতে অব্যাহতি পান সাংবাদিক রাজা মিয়া। যদি ভিকটিম শামীম উদ্ধার না হতো তবে ইতিমধ্যে সাংবদিক রাজা মিয়ার ফাঁসি হয়তো কার্যকর হয়ে যেত।

মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে ভূলভাবে একজনের পিছনে দৌড়ে মূল হত্যাকারিকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখায় এখন নিহত ব্যক্তির বিচার কি আদো হবে ? হলে কে হবে আসামী ? তাহা তদন্ত সাপেক্ষে আইননুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য আইন পাস করা উচিত এবং আইনের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আইনের পাশাপাশি সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। একত্রে থাকলে শক্তি পাওয়া যায় এবং প্রতিপক্ষ ভীতচিত্ত অবস্থায় থাকে। দেশে দিন দিন সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতন বেড়েই চলেছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংবাদিকের ওপর হামলা হচ্ছে। বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। কিন্তু এর কোনো বিচার লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় সাংবাদিকরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে। সরকারের উচিত সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ নজর দেয়া এবং সাংবাদিক নেতাদের উচিত সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবি উপস্থাপন করা। মফস্বল সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হন। আর এমনিতেই তো মফস্বল সাংবাদিকতা একটা চ্যালেঞ্জিং পেশা। এটা দেশের সব শ্রেণির জনগণই জানে। এক প্রকার যুদ্ধ করেই টিকে থাকতে হয় মফস্বল সাংবাদিকদের।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও চেয়ারম্যান এআরএফবি।

(খোলা কলামে প্রকাশিত সব লেখা একান্তই লেখকের নিজস্ব মতামত। এর সাথে পত্রিকার কোন সম্পর্ক নেই)

এআইআ/এইচি

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: