জাহাঙ্গীর আলম ভুঁইয়া

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

নদী গিলছে বতসভিটা, অন্ধকার নামলেই মরণ ভয়!

   
প্রকাশিত: ১২:৩৮ অপরাহ্ণ, ২৩ জুলাই ২০২২

পরিবার নিয়ে নদীর পাশে সুখের নীড় গড়ে তুললেও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে নদীভাঙন। চোখের সামনেই নদী প্রতিনিয়তই গিলছে কষ্টের গড়া বতসভিটা। ঘোলা পানিতে ভেসে যাচ্ছে বেঁচে থাকা আর তার সাথে তলিয়ে যায় পৃথিবীর আলো দেখার স্বপ্ন। উৎবেগ আর উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করছে নদী ভাঙ্গন কবলিত শত শত মানুষ, কথা গুলো বলছিলে জমিরুন নেছা (৫০)।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের চিসকা গ্রামের বাসিন্দা জমিরুন নেছা। জন্মের পর থেকেই এখানে বসবাস করছেন। প্রতিবছর পাহাড়ি ঢলে চোখের সামনেই নিজের ঘর পানি ভেঙ্গে বৌলাই নদীতে বিলীন হবার পথে। কিন্তু ভাঙ্গন প্রতিরোধে আজও নেয়া হয়নি কোনো কার্যকর প্রদক্ষেপ।

দিনের বেলা সবার সাথে মিলেমিশে কাটালেও বেলা শেষে অন্ধকার নামলেই চলে আসে মরণ ভয়। নদীভাঙনের তীব্রতা যে হারে বাড়ছে চিন্তা হয় কখন যেন ঘুমের মধ্যে পরিবারসহ স্বপ্নের নীড় চলে যায় নদীতেই। এই ভেবেই উৎবেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে কথা গুলো বলেন বৌলাই নদী পাড়ের বাসিন্দা আবুল কালাম। তিনি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের ধুতমা গ্রামের বাসিন্দা।

বন্যার আগ্রাসনের পর নদীভাঙনের কবলে দিশেহারা সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা ও বৌলাই নদীর তীরবর্তী জনপদের পাঁচ শতাধিক পরিবারের মানুষ। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো ও সচেতন মহলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিন উপজেলার বালিজুরী ইউনিয়নের যাদুকাটা নদীর তীরবর্তী দক্ষিণকুল ঝালহাটি, ফাজিলপুর, দক্ষিন মাহতাবপুর, পিরুজপুর, তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের চিসকা, সীমানা, বীরনগর, ধুতমা, বাদাঘাট ইউনিয়নের সোহালা, পাঠানপাড়া, বিন্নাকুলি সহ নদীর পাড়ের গ্রামের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, হতদারিদ্র পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। ইতোমধ্যে অনেক বাড়ি, মসজিদ, মন্দীর, শিক্ষা প্রতিষ্টান ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। অনেক বসত ভিটায় বড়-বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। নদীতে বিলিন হবে সাথে তাহিরপুর-আনোয়ারপুর-সুনামগঞ্জ সড়কটিও। ভাঙন অব্যাহত থাকায় কখন যেন তাদের ডাক আসে নদীতে চলে যাওয়ার।

ক্ষতিগ্রস্তরা জানায়, গত পাচঁ বছরের বেশি সময় ধরে নদী বিরামহীন ভাবে ভাঙছে। ভাঙনরোধে নেয়া হচ্ছে না যথাযথ কোনো ব্যবস্থা। নির্ঘুম রাত কাটানো এই জনপদের মানুষ গুলোর পরিবার নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। অভিযোগ করে এসব পরিবার জানায়, পাহাড়ি ঢল ও নদী দিয়ে বড় বড় নৌকা, স্পিডবোট চলাচল করার কারণে ঢেউয়ে আঘাতেও ভাঙন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভাঙনে আমাদের সব স্বপ্ন তলিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কর্তৃপক্ষ এখনো কোন ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। বার বার বলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। ব্যবস্থা নেই নিচ্ছি বলেই সময় পার করছেন দায়িত্বশীলরা। এ দিকে প্রতি বছরই নদীভাঙনে বিলীন এমন একাধিক পরিবারের বসতভিটা। বারবার স্থান পরিবর্তন করেও রক্ষা মিলছে না তাদের।

যাদুকাটা নদীর ভাঙ্গনের মুখে বালিজুরী ইউনিয়নের ঝাল হাটি গ্রামের বাসিন্দা জনি দাস জানায়, পাহাড়ী ঢলে নদীভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে এই অসহায় পরিবারগুলোর প্রতি মুহুর্তে ছেলেমেয়ে নিয়ে চিন্তার শেষ নেই। প্রতি বছরেই ভাঙনের কবলে এই পরিবার গুলোর এখন মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। ছোট নদী প্রতিদিন ভেঙে এখন বিশাল আকার ধারণ করেছে।

তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়ক ও বৌলাই নদীর পাড়ের তাহিরপুর সদর ইউনিয়ন চিসকা সীমানা গ্রামের বাসিন্দা আরিফুর রহমানসহ অনেকেই জানান, প্রতিবছর পাহাড়ী ঢলে নদী ভেঙ্গে আমাদের বসত বাড়িতে এমনকি আমাদের মত গরীব মানুষ মরলেও কারো কিছু যায় আসে না। নদী যে ভাবে ভাঙ্গছে আর এক হাত ভাঙ্গলেই আমার বাড়িসহ শতাধিক বাড়ি নদীতে বিলিন হবে সাথে তাহিরপুর-আনোয়ারপুর-সুনামগঞ্জ সড়কটিও।

সচেতন মহল বলছেন, এখনো যদি নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধ পদক্ষেপ নেয়া হয় তবে নদীর তীরের মানুষেরা ফিরে পাবে বাঁচার নতুন স্বপ্ন। না হলে বসত ভিটে হারানো মানুষগুলো উদ্বাস্তুতে পরিনত হবে।

বালিজুরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজাদ হোসাইন জানান, নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধ দ্রত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে নদীর তীরবর্তী বাড়ি ঘর ভেঙে নদীতেই বিলিন হয়ে যাবে। অনেকেই নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে এলাকা ছেড়ে শহরে আবার অনেকেই অন্যত্র বসত বাড়ি গড়ে বসবাস করছেন।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী শাসসুদ্দোহা বলেন, নদী ভাঙনের বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। বরাদ্দ আসলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ রায়হান কবির বলেন, নদীভাঙন রোধে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, আমি গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দ্রত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ায় জন্য বলব।

শাকিল/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: