
চুয়াডাঙ্গা জেলায় মাঠ ফসলের জমির পরিমাণ কমতে শুরু করেছে। গত এক দশকে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর কৃষি জমি কমে গেছে। এসব কৃষি জমি হ্রাসের প্রধান কারণ হলো দখল করে স্থাপনা নির্মাণ। জেলার অধিকাংশ মাঠ ফসলের জমিতে গড়ে উঠেছে কংক্রিটের বিভিন্ন দালান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা। কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি জমির রেজিস্ট্রেশন খরচ ও দাম কম হওয়ায় একটি অসাধু চক্র কৃষি জমি গ্রাস করছে। এর ফলে একদিকে যেমন কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের পরিমাণ কমছে, তেমনি কৃষি প্রকৃতি ও জলবায়ুর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন কৃষি মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, একসময় চুয়াডাঙ্গা শহরের দৌলতদিয়া-আলুকদিয়া সড়কের পাশে চোখে পড়ার মতো মাঠ ফসলের দৃশ্য ছিল, যা এখন অচেনা। অবিরাম ধানক্ষেত এখন আর দেখা যায় না। এই এলাকার প্রায় অর্ধেক মাঠ ফসল দখল হয়ে গেছে। এসব ফসলি জমির ওপর এখন গড়ে উঠেছে বিভিন্ন কংক্রিটের বড় বড় দালান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এর পাশাপাশি দিন দিন মাঠ ফসলি জমির ওপর ইটভাটা নির্মাণও বাড়ছে, যা ফসলের ক্ষতি করছে এবং উৎপাদন কমাচ্ছে। ফলে কৃষকরা তাদের কৃষি ফসলের 'যৌবন' হারাচ্ছেন। জেলার বিভিন্ন এলাকার ফসলি জমি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। বিক্রিত জমিগুলোর মূল্য ও রেজিস্ট্রেশন খরচও কম হওয়ায় এক শ্রেণির অসাধু লোকজন এসব কৃষি জমি গ্রাস করে নিচ্ছে। একদিকে যেমন কৃষি ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে, অপরদিকে কৃষি প্রকৃতি ও জলবায়ুর ওপর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জেলার সব এলাকায় কৃষি জমি কমে যাওয়ায় কৃষি ফসল হুমকির মুখে পড়ছে।
জেলার কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই জেলায় কৃষকরা বছরে তিন থেকে চার ফসলি আবাদ করে থাকে, যার অর্থনৈতিক চাহিদার অর্ধেক আসে মাঠ ফসল থেকে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কৃষি জমির পরিমাণ ছিল ৯৯ হাজার ৪৮১ হেক্টর। এরপর থেকে এটি ক্রমাগত কমতে থাকে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৯৮ হাজার ৭৪০ হেক্টর, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯৮ হাজার ৪০০ হেক্টর, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৯৮ হাজার ২৭৪ হেক্টর, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৯৭ হাজার ৫৭৩ হেক্টর, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৯৭ হাজার ৭৯ হেক্টর, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯৬ হাজার ৩৫৩ হেক্টর, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৯৫ হাজার ৬৩৯ হেক্টর এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯৪ হাজার ৯২৭ হেক্টর জমি ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি জমির পরিমাণ ছিল ৯৮ হাজার ২২০ হেক্টর। যা এই জেলার মাঠ ফসলের জমির পরিমাণ কমেছে ০.৭২ শতাংশ। গেল এক দশকে ৫ হাজার হেক্টর কৃষি জমির পরিমাণ কমেছে। এখন চলছে খরিপ-২ মৌসুম। এই চলতি মৌসুমে মাঠে চাষাবাদ হচ্ছে আমন ধান, বিভিন্ন সবজি, মাসকলাই, তুলা ও গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ।
চুয়াডাঙ্গা সদর আলুকদিয়া গ্রামের কৃষক কুদ্দুস মিয়া বলেন, "এই আলুকদিয়া ও দৌলতদিয়ারের বিভিন্ন মাঠ জুড়ে ফসল থাকতো। কিন্তু এখন বিভিন্ন মাঠ জুড়ে উঠে পড়েছে ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এতে কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। মাঠে কৃষি ফসল ফলানো যাচ্ছে না। ফলে চাষাবাদ কমে যাচ্ছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে কৃষি জমি হুমকির মুখে পড়বে।"
আরেক কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, "এখন কৃষি জমির দাম কম, আবার রেজিস্ট্রেশন খরচও কম। আর তাই কৃষি জমির ওপর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ছে। সেই সাথে দিন দিন মাঠ ফসলি জমির ওপর ইটভাটা নির্মাণও বাড়ছে। এতে যেমন ফসলের ক্ষতি হচ্ছে, ঠিক তেমনি ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। মাঠ ফসলের জমি বিক্রি করছে এক শ্রেণির অসাধু লোকজন। তাই দাবি জানাচ্ছি কৃষি জমির পরিমাণ বাড়াতে হবে। সেই সাথে কৃষি জমির বিক্রি বন্ধ করতে হবে।"
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, "কৃষি জমির পরিমাণ কমে গেলে তো খাদ্য ঘাটতি পড়বে। সেই সাথে কৃষি ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। আমরা দেখছি যে জেলার অধিকাংশ মাঠ ফসলের জমির ওপর গড়ে উঠতে শুরু করেছে কংক্রিটের বিভিন্ন দালান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা। তবে এ ব্যাপারে কৃষি বিভাগ কাজ করছে, যাতে করে আর যেন কৃষি জমির পরিমাণ না কমে। কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে কৃষি জমি রক্ষা করার জন্য।"
রার/সা.এ
সর্বশেষ খবর