
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে নানান কারণে আলোচনায় উঠে আসছেন প্রার্থীরা। তাদের মধ্যে কেউ রাজনৈতিক কারণে, কেউবা অভিনব প্রচারণা ও সাবলীল বাচনভঙ্গির কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন।
তেমনই একজন উম্মা উসওয়াতুন রাফিয়া। সবাই তাকে রাফিয়া খন্দকার নামে চেনেন। জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে মাঠের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন ঢাবির আইন বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের এ শিক্ষার্থী। আসন্ন ডাকসু নির্বাচনে কার্যনির্বাহী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গত ১৯ আগস্ট তিনি ডাকসুতে প্রার্থিতা ঘোষণা করেন। একই দিনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।
সম্প্রতি ডাকসুর প্রার্থীদের ব্যালট নম্বর প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। তাতে সদস্য পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রাফিয়ার ব্যালট নম্বর ৩২। ব্যালটের এমন নম্বর পেয়েই অভিনব প্রচারণায় নেমেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) রাতে নিজের ফেসবুক আইডিতে ছবি, ব্যালট নম্বর ও পদের নামসহ একটি ফটোকার্ড শেয়ার দিয়ে ভোট চেয়েছেন রাফিয়া। সেই ছবিতে নয়, ক্যাপশনে বাজিমাত করেছেন তিনি। ক্যাপশনে রাফিয়া লিখেছেন, ‘ধানমন্ডি ৩২ মন্দ হলেও ডাকসু সদস্যপদের ৩২ নং ব্যালট কিন্তু একেবারেই উল্টো। কাজে কাজেই সুতরাং- ৯ তারিখ সারাদিন, ৩২-এ ভোট দিন!’
তবে ধানমন্ডি ৩২ টেনে এনে পোস্ট দেওয়ায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মুখে পড়েছেন রাফিয়া। তার পোস্টে প্রচুর নেতিবাচক মন্তব্য আসতে শুরু করে। অনেকে অ্যাংগ্রি রিয়্যাক্ট (রাগান্বিত) করেছেন। বাধ্য হয়ে রাফিয়া কমেন্ট লিমিটেড করে দিয়েছেন। একই সঙ্গে মন্তব্যের ঘরে তিনি লিখেছেন, ‘বট আক্রমণ করে দেখি রিচ বেড়ে গেল। ধন্যবাদ।’
রাফিয়া আগে থেকে বই লেখেন। বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে পরিচিতি ছিল। তবে গত ১৯ আগস্ট মনোনয়নপত্র তোলার দিনে গণমাধ্যমে সাবলীলভাবে নিজের মনের কথা ও ডাকসু নির্বাচন নিয়ে তার প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে আলোচনায় আসেন।
সেদিন রাফিয়াকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন নির্বাচনে হার-জিত নিয়ে। তার জবাবে কবির ভাষায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি অকৃতি অধম বলেও তো কিছু/ কম করে মোরে দাওনি; যা দিয়েছো, তারি অযোগ্য ভাবিয়া/ কেড়েও তা কিছু নাওনি।’
উসওয়াতুন রাফিয়ার নির্বাচনী ইশতেহার
স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় রাফিয়া নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা ঘটা করে করেননি। এক্ষেত্রেও তিনি বেছে নিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক। সেখানে কিছু ব্যতিক্রমী শব্দের ব্যবহারে ভোটার ও তার শুভাকাঙ্ক্ষীতের মন কেড়েছেন। তার ভাষ্যমতে, তিনি অন্যদের মতো ‘জৌলুশপূর্ণ দীর্ঘ’ ইশতেহার ঘোষণা না করে মাত্র দুটি ‘বাস্তবসম্মত’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
নির্বাচিত হলে শিক্ষার্থীদের বেসিক চাহিদাগুলো পূরণের চেষ্টা করবো
রাফিয়া লেখেন, নির্বাচনের আগে গালভরা কিছু ইশতেহার আর মুখে অহিংসা বোল প্রচার করে জয়ী হওয়া যায়। কিন্তু কথা রাখা যায় না। স্রেফ কটা ভোট বেশি পাওয়ার জন্য স্বল্প বাস্তব এ কথাগুলো বলা আমার আসলে সাজে না। আমি মনে করি ডাকসু ভিপির পক্ষেও সবকিছু করা সম্ভব নয়। তাই আমি শুধু দুটি ইশতেহার ঘোষণা করছি।
প্রথম ইশতেহার: শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা
রাফিয়া নির্বাচিত হলে সব বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ নেবেন। শিক্ষার্থীরা প্রতি সেমিস্টার বা বছরে নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে গোপনীয়ভাবে শিক্ষক মূল্যায়নে অংশ নিতে পারবেন। সিস্টেমটি পুরোপুরি কনফিডেন্সিয়াল থাকবে, যাতে শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে মতামত জানাতে পারেন।
দ্বিতীয় ইশতেহার: ট্রাইব্যুনালের জবাবদিহি
সদস্য প্রার্থী রাফিয়ার দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন তদন্ত ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে। অভিযোগ বছরের পর বছর ঝুলে থাকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সিনেটে নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ট্রাইব্যুনালগুলোকে নিয়মিত জবাবদিহি করতে হবে। গোপন তথ্য প্রকাশ না করেও অভিযোগের অবস্থা, কতদিন ধরে ঝুলে আছে, কতটা অগ্রগতি হয়েছে এবং সম্ভাব্য সময়সীমা সম্পর্কে তথ্য দেওয়া সম্ভব।
‘প্রয়োজনে ছাত্র প্রতিনিধিরা ট্রাইব্যুনালকে দ্রুততম সময়ে মীমাংসায় আসার জন্য চাপ প্রয়োগ করবে। এতে অভিযোগকারী তার অভিযোগ কোন স্টেজে আছে তা অনলাইনে ট্র্যাক করতে পারবেন।’
ইশতেহারে তিনি ছাত্রদের যৌক্তিক দাবির পাশে থাকার ঘোষণাও দেন। অন্য প্রতিশ্রুতি না থাকলেও শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি নিয়ে সবসময় পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন এ প্রার্থী।
তার ভাষায়, ‘উপরিউক্ত কাজগুলো বাদে আমি কিছুই করবো না তা নয়। যৌক্তিক দাবির পক্ষে আমাকে আপনারা পাশে পাবেন সবসময়। তবে এ দুই ব্যাপার নিয়েই এক্সক্লুসিভলি কাজ করার ইচ্ছা রাখি।’
সবশেষ রাফিয়া জানিয়েছেন, তিনি ডাকসুর জন্য একটি ওয়েবসাইটও তৈরি করেছেন। সেখানে ‘আপনার প্রত্যাশা’ নামে একটি অপশন রাখা হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা সরাসরি তাদের মতামত ও প্রস্তাব জানাতে পারবেন।
রার/সা.এ
সর্বশেষ খবর