
২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে কুষ্টিয়াগামী হানিফ পরিবহনের (গাড়ি নং-৩৭৫০) একটি বাসে ওঠার পর নিখোঁজ হন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই মেধাবী শিক্ষার্থী ওয়ালিউল্লাহ ও আল-মুকাদ্দাস। পরিবারের অভিযোগ, সাভারের নবীনগর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের তুলে নিয়ে যান। দীর্ঘ ১৩ বছর কেটে গেলেও আজও তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, আল-মুকাদ্দাস ছিলেন আল-ফিকহ্ অ্যান্ড লিগ্যাল স্টাডিজ বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। পাশাপাশি তিনি শাখা ছাত্রশিবিরের বায়তুলমাল সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। অন্যদিকে ওয়ালিউল্লাহ পড়াশোনা করতেন দাওয়াত ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে। তিনি ছিলেন সংগঠনের সাংস্কৃতিক সম্পাদক।
এই দুই শিক্ষার্থীকে ফেরত দেওয়ার দাবিতে শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করেছে শাখা ছাত্রশিবির। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে এ মানববন্ধন হয়। মানববন্ধনে শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মাহমুদুল হাসান, সেক্রেটারি ইউসুফ আলী, প্রচার সম্পাদক আবসার নবী হামজা ও আন্তর্জাতিক সম্পাদক হাসানুল বান্নাহ অলিসহ দুই শতাধিক নেতাকর্মী অংশ নেন।
মানববন্ধনে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা “আমার ভাইয়ের খোঁজ দিতে হবে, দিয়ে দাও। প্রশাসনের টালবাহানা মানি না, মানব না। আমার ভাই আয়নাঘরে, প্রশাসন কী করে? ওলি-মুকাদ্দাস আয়নাঘরে, প্রশাসন কী করে?” সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
মানববন্ধনে গুমের শিকার ওয়ালিউল্লাহর বড় ভাই অধ্যক্ষ সাইফুল্লাহ বলেন, “যখন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি, তখন আমার পা কেঁপে ওঠে। কারো সঙ্গে ঠিকভাবে কথা বলতে পারি না, কথা বলার সময় কণ্ঠও কেঁপে ওঠে। এই কষ্ট শুধু ভুক্তভোগীরাই বুঝতে পারবেন। যখনই ক্যাম্পাসে আসি, বাবা-মাকে বলতে পারি না। কারণ তাদের চোখের সামনে এই দুঃখ প্রকাশ করা যায় না। আমরা চাই না কেউ এভাবে গুম হোক। এ ধরনের গুম একটি জাতিকে ধ্বংস করে দেয়। বর্তমান প্রশাসনকে প্রতিবাদের ভাষায় জানাতে চাই, তৎকালীন প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের গুম করা সম্ভব নয়। সেই সময় আমি ও মুকাদ্দাসের ছোট কাকা প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে গিয়ে খোঁজ নিয়েছিলাম তারা কোথায় আছে। তখন জানতে পেরেছি, তৎকালীন প্রশাসন চিহ্নিত করেছিলেন যে, তারা কোথায় থেকে গুম হয়েছেন। এরপর আর সন্ধান পাইনি। আমার বাবা সবসময় বলেন, ‘আমার সন্তান যদি আর বেঁচে না থাকে, অন্তত তার কবরের সন্ধান দিন।’ একই সঙ্গে সারাদেশের সব গুমের শিকার মানুষদেরও সন্ধান চাই।”
শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মাহমুদুল হাসান বলেন, “ফ্যাসিবাদের পতনের এক বছর পার হলেও আমরা এখনো ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসের কোনো খোঁজ পাইনি। প্রধান উপদেষ্টাসহ সরকারকে জানাতে চাই, শিক্ষার্থীরা আন্দোলনসহ সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সরকার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আপনাদের গুম কমিশন আসলে একটি অথর্ব কমিশন। তারা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে ফ্যাসিবাদকেই প্রশ্রয় দিচ্ছে। গুম কমিশনের প্রতিবেদন শিক্ষার্থী ও জাতির সামনে প্রকাশ করুন। না হলে এই ব্যর্থতার দায় আপনাদেরকেই নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, তৎকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি, প্রক্টর, প্রভোস্ট, ছাত্রলীগ-গুন্ডালীগের নেতাকর্মী এবং স্থানীয় ডিজিএফআই ও এনএসআইসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তলব করা হলে আমরা বিশ্বাস করি, ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসের সন্ধান পাওয়া যাবে। বিপ্লবের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমরা ইবি প্রশাসনের কাছে আমাদের গুম হওয়া দুই ভাইদের বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। এখনো ইবি ভিসিকে ওয়ালিউল্লাহ-আল মুকাদ্দাসের নামটাও নিতে দেখিনি। যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়কে অচল করে দেওয়া হবে।
এছাড়া তিনি বলেন, সুশীলতার নাটক বন্ধ করুন। সুশীলতা কিসের জন্য? যদি ওয়ালিউল্লাহ-আল মুকাদ্দাসের সন্ধান না দেওয়া হয়, আমরা আরও কঠোর পদক্ষেপ নেব। প্রয়োজনে প্রশাসনে তালা ঝুলিয়ে দেব, তখন আপনারা পালাতে বাধ্য হবেন। একই সঙ্গে সাজিদ আব্দুল্লাহর খুনিদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করারও দাবি জানাচ্ছি।”
সর্বশেষ খবর
ক্যাম্পাস এর সর্বশেষ খবর