দেশের বিভিন্ন বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাবে। এই সিদ্ধান্ত আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। এর ফলে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স ব্যবসায়ীরা। তাঁরা এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তা পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছেন। আজ শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটিতে সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দরা এই দাবি জানান।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাফা)-এর সদস্যরা বলেন, চার্জ বৃদ্ধির এই পদক্ষেপ দেশের সার্বিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং রপ্তানিকারকদের জন্য বিরাট চাপ তৈরি করবে, যা দেশের রপ্তানিকে ব্যাহত করবে। তাঁরা আরও যোগ করেন যে, অতিরিক্ত চার্জ বৃদ্ধির কারণে রপ্তানি হ্রাস পেলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যেহেতু দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা রপ্তানি আয়ের ওপর নির্ভরশীল।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে বাফা কমিটি বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে বাফার সাধারণ সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জনাব আবরারুল আলম, জনাব আদনান এমডি ইকবাল, জনাব মুনিম মাহফুজ, জনাব আনোয়ার হোসেন মিলন, জনাব আবুল হাসনাত, জনাব শামসুল হক এবং জনাব তরিকুল ইসলাম তারেকসহ অন্যরা। জনাব আবরারুল আলম লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত ট্যারিফ প্রয়োগনীতি ও সার্বিক বাজার সংকটের এই ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশন (বিসিডিএ) কর্তৃক অযৌক্তিকভাবে রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ ২০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে, যা এই ক্রান্তিলগ্নে দেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে একটি বড় উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী:
- ২০ ফুট রপ্তানি কনটেইনারের চার্জ ৬,১৮৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯,৯০০ টাকা করা হয়েছে।
* ৪০ ফুট কনটেইনারের চার্জ ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩,২০০ টাকা করা হয়েছে।
* ৪৫ ফুট হাই-কিউব কনটেইনারের চার্জ ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪,৯০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়াও খালি কনটেইনার, লিফট-অন/লিফট-অফ, ডকুমেন্টেশন, গ্রাউন্ড রেন্টসহ প্রায় সব সার্ভিসে অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করা হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগগুলো হলো:
- ১. বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও বাজার সংকটের মধ্যেও দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ব্যয়ভার সংকোচনের লক্ষ্যে দেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিরলস প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিসিডিএ কর্তৃক এই অস্বাভাবিক ও অসময়োপযোগী মূল্যবৃদ্ধির পদক্ষেপ দেশের সার্বিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং রপ্তানিকারকদের জন্য বিরাট চাপ তৈরি করবে, যা দেশের রপ্তানিকে ব্যাহত করবে, যা নিতান্তই অপ্রত্যাশিত।
২. বৈদেশিক ক্রেতা হারানোর আশঙ্কা: বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক দাম আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের অন্যতম শক্তি। হ্যান্ডলিং খরচ বৃদ্ধির ফলে এ প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে এবং বৈদেশিক ক্রেতারা বিকল্প বাজারে চলে যেতে পারেন।
৩. ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকগণ সংকটে পড়বে: বড় প্রতিষ্ঠান হয়তো কিছুটা সামাল দিতে পারলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান রপ্তানি সীমিত বা বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে।
৪. জাতীয় অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে: যেহেতু দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা রপ্তানি আয়ের উপর নির্ভরশীল। অতিরিক্ত চার্জ বৃদ্ধির কারণে রপ্তানি হ্রাস পেলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দের দাবি:
- * হ্যান্ডলিং চার্জ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা হোক।
- * রপ্তানি বাণিজ্যের স্বার্থে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে হস্তক্ষেপের আহ্বান।
- * ট্যারিফ বাড়ানোর পরিবর্তে সার্ভিস উন্নয়ন, কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ডিপোগুলো পরিচালনা করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিসিডিএ-এর প্রতি আহবান: দেশের সাধারণ ফ্রেইট ফরওয়ারডার্স, রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বিসিডিএ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হচ্ছে যে:
১. কার্গো আনলোডের সময় কমিয়ে দ্রুত কার্গো হ্যান্ডেলিংয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে অযথা বিলম্ব না ঘটে, যা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং ডিপোগুলিতে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে হবে।
২. ইকুইপমেন্ট সমস্যা সমাধান করে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও স্টোরেজে আধুনিক যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করতে হবে।
৩. শ্রমিক সংকট দূর করে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ ও দক্ষ শ্রমিকের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।