বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলের মানুষ সমুদ্রকে ভাবত আশীর্বাদ হিসেবে- জীবিকার উৎস, সৌন্দর্যের সম্ভার, কৃষি ও মৎস্যচাষের নির্ভরশীলতা। কিন্তু গত দুই দশকে সেই সমুদ্রই যেন উল্টো অভিশাপ হয়ে ফিরে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঘন ঘন দুর্যোগ, সাগরের উচ্চতা বৃদ্ধি- সব মিলিয়ে কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ ও দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নদী, পাহাড় ও বঙ্গোপসাগরঘেরা টেকনাফের উপকূলরেখা একসময় সবুজ খেত আর বসতির জৌলুসে ভরপুর ছিল। সেন্টমার্টিনও ছিল নারিকেল জিনজিরার স্বর্গরাজ্য। কিন্তু এখন সেই জায়গাগুলোই ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের লোনাজলে।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, টেকনাফে সমুদ্র গিলেছে কয়েক শ হেক্টর আবাদি জমি। সেন্টমার্টিন দ্বীপের বিভিন্ন অংশে গত এক দশকে পানি ঢুকেছে ৪০-৫০ মিটারেরও বেশি ভেতরে। হারিয়ে গেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, মাছ ধরার ঘাট, নারিকেলের বাগান এবং কৃষিজমি। অতীতে যেখানে ধান ফলত- আজ সেখানে লবণাক্ততা এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে লবণ চাষও অসম্ভব।
সেন্টমার্টিনের ইউপি সদস্য সৈয়দ আলম জানান, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর দ্বীপের আয়তন ছিল ১৩.৩৭ বর্গকিলোমিটার। এখন সেটি ভেঙে নামতে নামতে ১১ বর্গকিলোমিটারে এসে দাঁড়িয়েছে।
দ্বীপে বিভিন্ন ধরনের গাছপালা, বিশেষ করে নারিকেল ও ঝাউবাগান, দুর্যোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু ঘন ঘন জলোচ্ছ্বাস ও লোনা পানির আগ্রাসনে সেই সবুজ আজ প্রায় বিপন্ন।
তিনি যোগ করেন- পর্যটনই এখন স্থানীয়দের প্রধান আয়ের উৎস। কিন্তু পর্যটন কমে গেলে মানুষের জীবন-জীবিকা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, টেকনাফের বাতাসের তীব্র গতি ও ঢেউয়ের উচ্চতা ঠেকাতে ঝাউগাছের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবুও অসাধু চক্র রাতের আঁধারে এসব ঝাউগাছ কেটে ফেলছে। ফলে এইসব দুর্যোগ ক্রমশ বাড়ছে।
টেকনাফের বাসিন্দা জহির আহমেদ বলেন, ঝাউগাছ থাকলে পানি এত ভেতরে ঢোকে না। কিন্তু যারা রাতের অন্ধকারে ঝাউ কাটে, তারা পুরো উপকূলের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে।
আন্তর্জাতিক মানবিক তথ্যভাণ্ডার রিলিফ ওয়েব–এ ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা জানিয়েছে- কক্সবাজারের তুলনায় টেকনাফে তাপমাত্রা বাড়ছে দ্রুত। বৃষ্টিপাত কমছে, বাতাসের গতি বাড়ছে- যা উপকূলীয় ঝুঁকিকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গবেষণা বলছে, সাবরাং ইউনিয়ন উপকূলীয় ঝুঁকিতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, হ্নীলা ও হোয়াইক্যং মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ।
শাহপরীর দ্বীপের সাবেক ইউপি সদস্য নুরুল আমিন বলেন, পশ্চিম পাড়ার তিনটি গ্রাম ২০১২ সালে পুরোপুরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিশে গেছে। যাদের ঘর ছিল, জমি ছিল- সব হারিয়ে তারা এখন উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকছে। ২০১১ সালে বেড়িবাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। আগামী বছরে আরও তিন ফুট পানি বাড়তে পারে- এটা দুর্যোগ কর্মকর্তাদের সতর্কবার্তায় আছে। এখনকার বেড়িবাঁধ কতটা টিকবে সেটা সরকারের ভাবা জরুরি।
টেকনাফ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির জানান- টেকনাফের মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করতে অভ্যস্ত, কিন্তু এখন পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে। শক্ত বেড়িবাঁধ, গাছ রোপণ ও লবণ-সহিষ্ণু ফসল ছাড়া ভবিষ্যতে মানচিত্রেই টেকনাফকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে।
টেকনাফ উপকূলীয় বন কর্মকর্তা ভূমিকা আহমেদ জানান- ঝাউবাগান উপকূল রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর। তবে বিকল্প গাছের মাধ্যমেও উপকূল সুরক্ষার সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। মেরিন ড্রাইভ উপকূলে ইতোমধ্যে ১০০ হেক্টর বনায়ন করা হয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দিন বলেন- জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি উভয় উদ্যোগ প্রয়োজন। কৃষকদের জলবায়ুসহিষ্ণু ফসলের দিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণে প্রশাসন কাজ করবে।
স্থানীয়সহ সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিন শুধু একটি এলাকা নয়- এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু জলবায়ুর নির্মম বাস্তবতা আর মানবসৃষ্ট ক্ষতি মিলে এই অঞ্চলকে প্রতিদিন সংকুচিত করে তুলছে।
সমুদ্রের অগ্রযাত্রা থামানো যায় না, কিন্তু মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা যায়- টেকসই বেড়িবাঁধ, আরও বেশি বনায়ন, লবণ-সহিষ্ণু ফসল, সঠিক পরিকল্পনা ও নজরদারি- এসবই এখন সময়ের দাবি। এখনই পদক্ষেপ না নিলে সেন্ট মার্টিন ও টেকনাফের সবুজ মানচিত্রের জায়গায় ভবিষ্যতে হয়তো শুধু নোনা নীল সমুদ্রই থাকবে।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর