দুবাই- মরুভূমির বুকে এক আধুনিক স্বর্গ। যেখানে বুর্জ খলিফার নিয়ন আলো আর বিলাসবহুল জীবনযাত্রার আকর্ষণে প্রতি বছর ছুটে যান লাখো মানুষ। কিন্তু এই আলোকোজ্জ্বল জৌলুসের ঠিক নিচেই চাপা পড়ে আছে এক অন্ধকার বাস্তবতা। দুবাইয়ের নাইটক্লাব আর ড্যান্স বারগুলোতে কাজ করা হাজারো বাংলাদেশি নারীর জীবন আজ এক ‘সোনালি খাঁচায়’ বন্দি। যেখানে রঙিন আলো যত বাড়ে, তাদের জীবনের অন্ধকার ততটাই ঘনীভূত হয়।
ঢাকার বিমানবন্দর থেকেই শুরু হয় ‘অভিনয়’
এই পাচার প্রক্রিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এর সুনিপুণ পরিকল্পনা। পাচারের শিকার নারীদের কেবল বিদেশে পাঠানোই হয় না, বরং তাদের প্রস্তুত করা হয় একজন ‘উচ্চবিত্ত পর্যটক’ হিসেবে।
ঢাকার বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন অফিসারের চোখ ফাঁকি দিতে ড্যান্স বারের মালিকরা নিজ খরচে এসব তরুণীর জন্য আধুনিক ও দামী পোশাক কিনে দেন। তাদের শেখানো হয় কীভাবে স্মার্টলি কথা বলতে হয়। অফিসারদের সন্দেহ দূর করতে তাদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় দুবাইয়ের বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র—বুর্জ খলিফা, জুমেইরাহ বিচ কিংবা বুর্জ আল আরবের নাম। যদি প্রশ্ন করা হয়—“কেন দুবাই যাচ্ছেন?” উত্তর মুখস্থ করানো হয়—“ঘুরতে যাচ্ছি।” কিন্তু দুবাই পৌঁছানোর পর এসব পর্যটন কেন্দ্র দেখার সৌভাগ্য আর তাদের হয় না; তাদের গন্তব্য হয় কোনো এক ধোঁয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকার বার।
সাত দিনের ‘আইসোলেশন’ ও বন্দিত্ব
দুবাই বিমানবন্দরে নামামাত্রই সিন্ডিকেটের সদস্যরা তাদের রিসিভ করে সরাসরি নিয়ে যায় কোনো মেস বা ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্টে। সেখানে চলে প্রায় এক সপ্তাহের গোপন বন্দিত্ব। এই সময়ে তাদের বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। যখন তারা বুঝতে পারেন তারা ফাঁদে পড়েছেন, তখন শুরু হয় বারে যাওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি। নির্দিষ্ট বাসে করে কাজে নেওয়া আর কাজ শেষে আবার ফ্ল্যাটে বন্দি রাখা—এটাই হয়ে দাঁড়ায় তাদের দৈনন্দিন রুটিন। একা বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই, এমনকি প্রয়োজনীয় কেনাকাটাও চলে মালিকপক্ষের কড়া তদারকিতে।
শারজাহ থেকে আজমান: আইনি কড়াকড়ির আড়ালে ব্যবসা
সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহতে অ্যালকোহল ও নাইটলাইফ নিষিদ্ধ থাকায় পাচারকারীরা এই প্রদেশকে ব্যবহার করে তাদের ‘নিরাপদ আস্তানা’ হিসেবে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় শারজাহ থেকে বাসযোগে নারীদের নিয়ে যাওয়া হয় আজমান, ফুজাইরাহ বা রাস আল খাইমাহর বারগুলোতে।
ড্যান্স বারে কাজ করা নারীদের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। সেখানে তাদের কেবল নাচতে হয় না, বরং অতিরিক্ত মদ পান করে ক্লায়েন্টদের খুশি রাখতে হয়। কমিশন পদ্ধতিতে কাজ করা নারীদের ওপর চাপ থাকে সবচেয়ে বেশি। বেশি মদ বিক্রি মানেই বেশি আয়—এই ফর্মুলায় তারা নিজের লিভার এবং মানসিক স্বাস্থ্য তিলে তিলে ধ্বংস করে দিচ্ছেন। অনেক নারী জানিয়েছেন, চরম মানসিক চাপে তারা আত্ম-ক্ষতির হুমকি দেন, যা আসলে এক ধরনের সাহায্যের আকুতি।
দুবাই ছাড়িয়ে ব্যাংকক ও কুয়ালালামপুর
এই চক্রের জাল কেবল আরবে সীমাবদ্ধ নয়। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের বুকিত বিনতাং এলাকায় এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় রুম্পা (ছদ্মনাম) নামের এক চাকমা তরুণীর সঙ্গে। রেস্টুরেন্ট ওয়েটারের চাকরির প্রলোভনে তাকে সেখানে নেওয়া হয়েছিল।
রুম্পা জানান, "শুরুতে ওয়েটার হিসেবে কাজ দিলেও কয়েকদিন পর পাকিস্তানি মালিক আমাকে চীনের এক ব্যক্তির সঙ্গে রাত কাটাতে বলে। প্রতিবাদ করলে তারা জোর করে আমার আপত্তিকর ছবি তুলে রাখে। সেই ব্ল্যাকমেইলের মুখে আমি যেতে বাধ্য হই।"
একই চিত্র থাইল্যান্ডের ব্যাংককে। সুকুম্ভিট এলাকায় দেখা হয় কক্সবাজারের মহেশখালীর তানিয়া (ছদ্মনাম)-এর সঙ্গে। মাসে দুই লাখ টাকা আয়ের আশায় 'ট্যুরিস্ট' ভিসায় তাকে থাইল্যান্ড নিয়ে আসে দালাল রহিম শেখ। তানিয়া বলেন, "দালালরা পাসপোর্ট কেড়ে নিয়েছে। কোনো কাজ নেই, এখন পেটের দায়ে শরীর বিক্রি করতে হচ্ছে।"
একটি ব্যবস্থার শিকার
এই নারীরা স্বেচ্ছায় এই পেশায় আসেননি। দারিদ্র্য, পারিবারিক চাপ, প্রতারণা কিংবা দেশে কর্মসংস্থানের অভাব তাদের এই পথে ঠেলে দিয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে আমিরাত বা থাইল্যান্ডে শ্রমিক অধিকার থাকলেও, এই বিনোদন খাতের অন্ধকার গলিতে আইনের আলো পৌঁছায় না। পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া এবং ভিসার ভয় দেখিয়ে তাদের জিম্মি করে রাখা হয়।
দুবাইয়ের রাতের আলো যত উজ্জ্বল হচ্ছে, আয়েশা, তানিয়া বা রুম্পাদের মতো হাজারো নামহীন বাংলাদেশি নারীর জীবন ততটাই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। প্রবাসে শ্রমের মর্যাদা আর নারী নিরাপত্তা নিয়ে যে প্রশ্ন আজ উঠেছে, তার সমাধান না খুঁজলে এই ‘সোনালি খাঁচা’ আরও অনেক প্রাণ কেড়ে নেবে।
সর্বশেষ খবর
এক্সক্লুসিভ এর সর্বশেষ খবর