গাইবান্ধা জেলার প্রথম দফার মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) ও গাইবান্ধা-২ (সদর) আসনে মোট ১৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ৮ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, জাতীয় পার্টি, খেলাফত মজলিস এবং কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন।
শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এই যাচাই-বাছাই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা এই ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।
গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. মাজেদুর রহমানের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে এ কারণে যে, তিনি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। সরকারি বেতনভুক্ত চাকরিজীবী হিসেবে তার প্রার্থী হওয়া নির্বাচনী আইনে নিষিদ্ধ। তার মনোনয়নপত্র বাতিলের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচিত হয়েছে; অনেক ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলেছেন, অন্যান্য নির্বাচনে একই পেশার প্রার্থীরা কীভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
একই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী রমজান আলী এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. মাহফুজুল হক সরদারের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে দলীয় মনোনয়নপত্র সঠিক না হওয়ার অভিযোগে। নির্বাচন কমিশনের দাবি, তাদের দলীয় নেতৃত্ব থেকে প্রাপ্ত মনোনয়নপত্রে আনুষ্ঠানিক ত্রুটি ও অসামঞ্জস্যতা পাওয়া গেছে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী মোছা. সালমা আক্তারের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে সমর্থনকারী ভোটারদের তালিকা সঠিক না হওয়ার কারণে। তার দাখিল করা ভোটার তালিকায় তথ্যগত অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। অপর স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মোস্তফা মহসিনের মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়েছে।
অন্যদিকে, গাইবান্ধা-২ (সদর) আসনে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী মিহির কুমার ঘোষের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে দলীয় মনোনয়নপত্র সঠিক না হওয়ার অভিযোগে। দলীয় সূত্রমতে, মনোনয়নপত্র দাখিল প্রক্রিয়ায় সাংগঠনিক ত্রুটির কারণে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আরেক প্রার্থী মো. আব্দুল মাজেদের মনোনয়নপত্রও একই কারণে বাতিল হয়েছে। দলটির দুই আসনে দুজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় তাদের নির্বাচনী প্রস্তুতিতে বড় ধাক্কা লাগবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
খেলাফত মজলিসের প্রার্থী একেএম গোলাম আযমের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে হলফনামায় তার নিজস্ব স্বাক্ষর না থাকার কারণে। এটি একটি আনুষ্ঠানিক ত্রুটি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি এসব মনোনয়নপত্র যাচাই করেছে। তাদের দাবি, নির্বাচনী আইন ও বিধি-বিধান অনুসারে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, এই বাতিল সিদ্ধান্তগুলো গাইবান্ধার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে ইসলামী দলগুলোর একাধিক প্রার্থীর অযোগ্যতা ঐতিহ্যগত ভোটারদের জন্য নতুন চিন্তার সৃষ্টি করবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ইতিমধ্যেই এই বাতিল সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনেক ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলেছেন, কেন শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু দলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রে এত ত্রুটি পাওয়া যাচ্ছে।
মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া প্রার্থীদের জন্য আপিলের সুযোগ রয়েছে। তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের আপিল বিভাগে আবেদন করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট দলগুলোর পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই আইনি পরামর্শ শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
গাইবান্ধার বাকি তিনটি আসনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শীঘ্রই শুরু হবে। প্রথম দুই আসনের এই কঠোর সিদ্ধান্তের পর বাকি আসনগুলোর প্রার্থীরা তাদের মনোনয়নপত্র পরীক্ষা ও সংশোধনে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করবেন বলে ধারণা করা যায়।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের মতে, এই মনোনয়ন বাতিলের ঘটনা আসন্ন নির্বাচনের ভোটার মনোভাব ও রাজনৈতিক জোটের গতিপ্রকৃতিতে পরিবর্তন আনতে পারে। অনেক প্রার্থী ও দলীয় কর্মী এখন আইনগত জটিলতা এড়াতে আরও সচেতন হচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনের এই কঠোর অবস্থান পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে বলে মনে করছেন গাইবান্ধাবাসী।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর