চট্টগ্রাম নগরের প্রবেশমুখ বাকলিয়া থানার নতুন ব্রিজ এলাকায় চেকপোস্টে তল্লাশির সময় এক পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া এবং উদ্ধার করা মাদক আত্মসাতের অভিযোগে নয় পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে তাঁদের বরখাস্ত করা হয়।
বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যরা হলেন— বাকলিয়া থানার ওসি (তদন্ত) তানভীর আহমেদ,বাকলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আল-আমিন সরকার, এসআই মোহাম্মদ আমির হোসেন (বর্তমানে কোতোয়ালি থানায় কর্মরত), সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) সাইফুল আলম, মো. জিয়াউর রহমান, মো. সাদ্দাম হোসেন, এনামুল হক, কনস্টেবল মো. রাশেদুল হাসান ভূঞা ও নারী কনস্টেবল উম্মে হাবিবা।
এদিকে পুলিশ সূত্র জানায়, মাদকদ্রব্য আত্মসাৎ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান এবং বৈধ আদেশ অমান্য করার অভিযোগে পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল (পিআরবি) বিধি-৮৮০ অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, তদন্তের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় বাকলিয়া থানার ৮ জন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দিয়েছেন সিএমপি কমিশনার। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে।
সিএমপি দক্ষিণ বিভাগের ২২ নম্বর আদেশের অনুলিপি ও সাময়িক বরখাস্তের আদেশ সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে পুলিশ বিভাগ অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ অনুসন্ধানে সাবেক সিএমপির দক্ষিণ বিভাগের বাকলিয়া থানা এবং পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা থেকে প্রেরিত প্রতিবেদনে মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও আত্মসাতের ঘটনার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়।
অনুসন্ধানে উঠে আসে, গত ৮ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে কক্সবাজার জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল (আদালত-২) এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালতের দেহরক্ষী হিসেবে কর্মরত কনস্টেবল মো. ইমতিয়াজ হোসেন কোনো ছুটি না নিয়ে কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশে দেশ ট্রাভেলসের একটি এসি বাসে রওনা দেন। বাসটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-১৬৪২, কোচ নম্বর-৩৭ এবং আসন নম্বর-ই-১।
পরে দিবাগত রাত অর্থাৎ ৯ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ১টা ২০ মিনিটের সময় ঢাকাগামী ওই বাসটি বাকলিয়া থানার নতুন ব্রিজ পুলিশ চেকপোস্টে পৌঁছালে তল্লাশি করা হয়। এ সময় বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহম্মেদ, এসআই মোহাম্মদ আল-আমিন সরকার, এসআই মোহাম্মদ আমির হোসেন ও এএসআই মো. সাদ্দাম হোসেন তল্লাশিতে অংশ নেন। তল্লাশিকালে অফিসার ইনচার্জের উপস্থিতির কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলেও, ওই সময় তিনি ডবলমুরিং থানার নিজ বাসায় অবস্থান করছিলেন বলে দাবি করেন। এ দাবির সমর্থনে তিনি ডবলমুরিং থানার প্রবেশপথ ও বাসার ভিডিও ফুটেজ এবং মোবাইল ফোনের লোকেশন সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে বলেও প্রতিবেদককে জানান।
তদন্তে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলা পুলিশের কনস্টেবল মো. ইমতিয়াজ হোসেন ৮ ডিসেম্বর রাতে ঢাকার উদ্দেশ্যে দেশ ট্রাভেলসের একটি এসি বাসে (কোচ নং-৩৯-কক্স-ঢাকা, রেজি. নং ঢাকা মেট্রো-ব ১৫-১৬৪২, সিট নং ই-১) যাত্রী হিসেবে রওনা হন। তার সাথে থাকা একটি ট্রলি ব্যাগ (যা বাসের সাইট বক্সে রাখা ছিল) সম্পর্কে পুলিশের পক্ষ থেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তাকে বাস থেকে নামিয়ে পুলিশ বক্সে নিয়ে গিয়ে ট্রলি ব্যাগটি খোলা হয়। তল্লাশিতে ব্যাগের ভিতরে ১০ কাট, অর্থাৎ আনুমানিক ১ লাখ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। তবে অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে, বাকলিয়া থানায় কর্মরত সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসাররা উদ্ধারকৃত ইয়াবা আত্মসাৎ করেন এবং রাত আনুমানিক ৩টা ৩০ মিনিটে কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনকে থানা থেকে ছাড়েন।
তদন্তে আরও জানা গেছে, কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনের সঙ্গে কক্সবাজার সদর থানার কলাতলী এলাকার কিছু স্থানীয় ব্যক্তির যোগাযোগ ছিল। এর মধ্যে একজনকে তিনি মোশারফ নামে চিনতেন। মোশারফ কনস্টেবলকে নগদ ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার বিনিময়ে ইয়াবার একটি চালান ঢাকার উদ্দেশ্যে বহনের প্রস্তাব দেন। কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন অবৈধ প্রস্তাবে রাজি হয়ে ইয়াবা ভর্তি লাগেজ গ্রহণ করেন এবং কোনো ছুটি না নিয়ে রাত ১০টা ১৫ মিনিটে কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।
বাসটি কর্ণফুলী ব্রিজ পার হওয়ার পর রাত আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটে নতুনব্রিজ পুলিশ চেকপোস্টে থামে। এ সময় এএসআই মো. সাদ্দাম হোসেন একজন সিভিল ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে বাসে উঠেন এবং কনস্টেবল মো. ইমতিয়াজ হোসেনকে বাস থেকে নামিয়ে পুলিশ বক্সের ভেতরে নিয়ে যান। বাসের সুপারভাইজার মিজান পেছন থেকে তাদের অনুসরণ করলে, এসআই মোহাম্মদ আমির হোসেন তাকে বক্স থেকে বের করে দেন।
পুলিশ বক্সে তখন বাকলিয়া থানার পরিদর্শক-তদন্ত তানভীর আহমেদ টেবিলের সঙ্গে চেয়ারে বসা অবস্থায় ছিলেন এবং এসআই মো. আল আমিন সরকার দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর দুই পুলিশ সদস্য বাসের সুপারভাইজারকে নির্দেশ দেন, যাত্রীদের লাগেজ বের করতে। সুপারভাইজার বাসের সাইট বক্স থেকে কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনের একটি কাঁধের ব্যাগ এবং একটি ট্রলি ব্যাগ তুলে দুই পুলিশ সদস্যের হাতে দেন। পুলিশ বক্সের ভেতরে ট্রলি ব্যাগটি পুলিশের উপস্থিতিতে সিভিল চেকার টেবিলের ওপর রাখেন এবং খোলার চেষ্টা করেন। ঢাকনা সামান্য খোলার পর ভেতরে ইয়াবা দেখতে পেয়ে আবার ঢাকনা বন্ধ করেন। কনস্টেবল মো. ইমতিয়াজ হোসেন বিপুল পরিমাণ ইয়াবার সঙ্গে ধরা পড়ায় উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের কাছে নিজেকে সেফ এক্সিট দেওয়ার জন্য অনুনয় করেন। এই সময় পুলিশ সদস্যরা নিজেদের মধ্যে গোপনে আলাপ-আলোচনা করেন। পরে ট্রলি থেকে কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনের সামনে একে একে ৮টি ইয়াবার কাট বের করা হয়, প্রতিটি কাটে ১০ হাজার করে ইয়াবা ছিল। কনস্টেবল তার ভিডিও স্বীকারোক্তিতে দুই হাতের ইশারায় উদ্ধারকৃত ইয়াবার বক্সের আকারও দেখান। কিছুক্ষণ পর ট্রলি পুরোপুরি পুলিশ সদস্যদের হেফাজতে থাকে। কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, আরও এক–দুইটি ইয়াবার বক্সও ছিল। এরপর পুলিশ বক্সে থাকা পুলিশ সদস্যরা সমস্ত ইয়াবা নিজেদের দখলে রেখে শুধুমাত্র কাপড়চোপড়সহ লাগেজটি কনস্টেবলকে ফেরত দেন এবং তাকে চলে যেতে বলেন। কনস্টেবল বাস থেকে বের হয়ে বাসটি সঠিকভাবে দেখেননি। এ সময় এসআই মোহাম্মদ আমির হোসেন বাসের সুপারভাইজারকে নির্দেশ দেন, যাত্রীসহ বাসটি ঢাকার উদ্দেশ্যে চলে যেতে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ইয়াবা উদ্ধারের পর কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন ‘সেফ এক্সিট’ চেয়ে পুলিশ সদস্যদের কাছে অনুনয় করেন। এরপর ইয়াবার একাধিক কাট ট্রলি থেকে বের করে নেওয়া হলেও পুরো চালান পুলিশের হেফাজতে রেখে কেবল কাপড়চোপড়সহ ব্যাগটি ফেরত দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। তবে কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেনের স্বীকারোক্তি, বাসের সুপারভাইজারের বক্তব্য এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্যের জবানবন্দিতে পুরো ঘটনা প্রমাণিত হয়।
বিভাগীয় সর্বোচ্চ শাস্তির সুপারিশ সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ওয়াহিদুল হক চৌধুরীর পাঠানো বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা সংঘবদ্ধভাবে গুরুতর অনিয়ম, শৃঙ্খলাভঙ্গ ও মাদকদ্রব্য আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। প্রতিবেদনে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় সর্বোচ্চ শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে। বরখাস্তকালীন সময়ে পুলিশ সদস্যদের দামপাড়া পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করে নিয়মিত হাজিরা ও রোলকল দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর