ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের আশঙ্কা নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে। ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, মার্কিন প্রশাসনের ধারাবাহিক কড়া হুঁশিয়ারি এবং তেহরানের অনমনীয় অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে। কূটনৈতিক উত্তেজনা সামরিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
ট্রাম্পকে ‘রক্তে হাত রঞ্জিত’ বলে অভিযুক্ত খামেনি
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে তিনি অভিযোগ করেন, তথাকথিত ‘১২ দিনের যুদ্ধ’-এ এক হাজারের বেশি ইরানির মৃত্যুর জন্য ট্রাম্প সরাসরি দায়ী। নিহতদের মধ্যে সাধারণ নাগরিকদের পাশাপাশি শীর্ষ সামরিক কমান্ডার, বিজ্ঞানী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
‘আদেশ দিয়েছিলাম’ মন্তব্যকে দায় স্বীকার বললেন খামেনি
খামেনি ট্রাম্পের এক বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, সংঘাত চলাকালে ‘আদেশ দিয়েছিলেন’—এমন মন্তব্য কার্যত দায় স্বীকারের শামিল। তার ভাষায়, ট্রাম্প দাবি করেন তিনি ইরানি জাতির পক্ষে, অথচ বাস্তবে তার হাত ইরানিদের রক্তে রঞ্জিত। এ ধরনের বক্তব্যকে তিনি প্রতারণামূলক ও ভণ্ডামিপূর্ণ বলে আখ্যা দেন।
বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র আখ্যা, কড়া হুঁশিয়ারি তেহরানের
ভাষণে ইরানে চলমান বিক্ষোভকে বিদেশি মদদপুষ্ট বলে উল্লেখ করেন খামেনি। তিনি বলেন, কিছু মানুষ ওয়াশিংটনের মন জোগাতে দেশের বিভিন্ন শহরে ভাঙচুর ও অরাজকতা সৃষ্টি করছে। তার ভাষায়, ‘বিদেশিদের খুশি করতে যারা দেশের ক্ষতি করে, ইরানি জাতি তাদের ভাড়াটে মানসিকতা কখনোই মেনে নেবে না।’ একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, কোনো বিদেশি শক্তির সামনে ইরান মাথা নত করবে না।
‘ট্রাম্পের পরিণতিও স্বৈরশাসকদের মতো হবে’
মার্কিন প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে খামেনি বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—ক্ষমতার চূড়ায় পৌঁছানো অনেক স্বৈরশাসক শেষ পর্যন্ত পতনের মুখ দেখেছে। ট্রাম্পের পরিণতিও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইরানে সহিংস বিক্ষোভ, ইন্টারনেট বন্ধ
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী আন্দোলন বর্তমানে সহিংস রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীরা ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক’ স্লোগান দিয়ে সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ করছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে সারা দেশে ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় ইরান সরকার। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, টানা ১২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ইরান কার্যত বিশ্ব থেকে অনলাইনে বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
ট্রাম্পের পাল্টা হুঁশিয়ারি
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান সরকারকে সতর্ক করে বলেছেন, অতীতে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে তেহরান। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি আবার সাধারণ মানুষের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর জবাব দিতে প্রস্তুত থাকবে। ট্রাম্প আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাধারণ জনগণের পাশে থাকবে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করতেও দ্বিধা করবে না।
নতুন সংঘাতের দিকে যাচ্ছে কি তেহরান–ওয়াশিংটন?
বিশ্লেষকদের মতে, ইন্টারনেট বন্ধ, ব্যাপক ধরপাকড় ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা ইরানে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভকে আরও উসকে দিতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া অবস্থান তেহরান–ওয়াশিংটনের মধ্যকার কূটনৈতিক উত্তেজনাকে নতুন সংঘাত ও সম্ভাব্য আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর