ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহর হত্যাকাণ্ডের ছয় মাস পেরোলেও এখনো ঘটনার রহস্য উদঘাটন হয়নি। সর্বশেষ এ ঘটনায় তদন্তভার অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) দেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘ ৪ মাস ধরে তদন্ত করেও এ ঘটনায় অভিযুক্ত সন্দেহভাজন কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি তারা। এ হত্যাকাণ্ড ঘিরে রহস্য আরো ঘনীভূত হচ্ছে। ফলে বিষয়টি ক্ষোভ বাড়ছে শিক্ষার্থীদের।
তবে একই সঙ্গে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের অভিযোগও উঠেছে একটি পক্ষের বিরুদ্ধে। সাজিদ হত্যার বিচার দাবিতে অনেক কর্মসূচিই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের সময়ের সঙ্গে মিল রেখেই পালন করা হচ্ছে। ফলে অভিযোগ উঠেছে একটি পক্ষ সাজিদকে ‘রাজনৈতিক ট্রামকার্ড’ হিসেবে ব্যবহার করছে। শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া বন্ধ করতেই সাজিদ ইস্যু দিয়ে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এজন্য এই ইস্যুতে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন সিলেকটিভ প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করছে পক্ষটি। হত্যার বিচার নয়; বরং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চাপ সৃষ্টি করাই মূল উদ্দেশ্য বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ অক্টোবর থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল স্টাডিজ বিভাগের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের কার্যক্রম শুরু হয়। এর দুই দিন আগে ৭ অক্টোবর শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড ও সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যার বিচারের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি করে শাখা ছাত্রদল। এসময় তারা নিয়োগ বোর্ড থেকে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের সরানোর দাবি জানান।
এর পরদিন ১০ অক্টোবর ল অ্যান্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এর ঠিক পরদিনই, ১১ অক্টোবর, পুনরায় অবস্থান কর্মসূচি করে শাখা ছাত্রদল।
এর চার দিন পর, ১৫ অক্টোবর, সাজিদের খুনিদের গ্রেপ্তার ও বিচার প্রক্রিয়ায় বিলম্বের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী প্রতীকী বোর্ড স্থাপনের মাধ্যমে প্রতিবাদ কর্মসূচি করে। এতে নেতৃত্ব দেন উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী বোরহান কবির এবং গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী ইশতিয়াক ফেরদৌস ইমন। পরবর্তীতে, ২১ অক্টোবর, সাজিদ হত্যার বিচারসহ মোট ৭ দফা দাবিতে দুপুরে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দেয় শাখা ছাত্রদল।
এর পরের দিনই, ২২ অক্টোবর কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া বিভাগ, ২৭ অক্টোবর ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, ২৯ অক্টোবর বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময়ের মাঝে ২৬ অক্টোবর উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী বোরহান কবিরের নেতৃত্বে সাজিদ হত্যার বিচারের দাবিতে কফিন মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়।
এদিকে পরে ২৬ অক্টোবর থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সাজিদ ইস্যুতে এই পক্ষটির কোনো আন্দোলন-কর্মসূচি দেখা যায়নি। এছাড়া এ সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডও অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে দীর্ঘ বিরতির পর ৯ ডিসেম্বর সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যার বিচারের দাবিতে ফের একটি মানববন্ধন কর্মসূচি হয়। এতে নেতৃত্ব দেন উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী বোরহান কবির।
ওই মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের পাশাপাশি বিএনপি ও জামায়াতপন্থী বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। কর্মসূচিতে বক্তারা ঘোষণা দেন, আগামী ১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার না করা হলে ভিসি কার্যালয় ঘেরাও করা হবে। ঠিক এর পরদিনই, ১০ ডিসেম্বর, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা হয়। ফলে ৯ ডিসেম্বরের আন্দোলনের সময় ও উদ্দেশ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে নিয়োগ প্রক্রিয়ার ঠিক আগমুহূর্তে কেন এই আন্দোলনÑতা নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
পরে পূর্বঘোষিত ১৭ ডিসেম্বরের ভিসি কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচির পরিবর্তে গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী ইশতিয়াক ফেরদৌস ইমনের নেতৃত্বে সাজিদ হত্যার বিচারের দাবিতে একদল শিক্ষার্থী একটি অভিনব প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। এরপরে ১৮ ডিসেম্বর থেকে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত এ ইস্যুতে এ পক্ষটির কোনো কর্মসূচি দেখা যায়নি। এছাড়া এ সময়ের মধ্যেও বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়নি।
জানা গেছে, আগামী ১১, ১৩ ও ১৪ জানুয়ারি বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে নিয়োগ পরীক্ষার সময় সাজিদ ইস্যুতে নতুন করে আন্দোলনের ঘোষণা দেন উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী বোরহান কবির। ফলে তার বিরুদ্ধে ফের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সাজিদকে ‘রাজনৈতিক ট্রামকার্ড’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠে। এ ধরনের কর্মসূচিতে নেতৃত্ব বিশেষ পক্ষ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্র সংগঠনকেও অংশ নিতে দেখা গেছে।
অভিযোগ উঠেছে, বোরহান কবিরসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী একটি পক্ষের ইন্ধনে শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড বন্ধ ও প্রশাসনকে চাপে রাখতেই এ ধরনের সিলেকটিভ প্রতিবাদ করছে। এ বিষয়ে বিএনপিপন্থী কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, “আমরাও সাজিদ হত্যার বিচার চাই। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিচার করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সেই ব্যর্থতাকে ব্যবহার প্রশাসনকে চাপে ফেলতে একটি পক্ষ সাজিদকে রাজনৈতিক ট্রামকার্ড হিসেবে ব্যবহার করছে। যখনই নিয়োগ পরীক্ষা আসে, তখনই তারা এই ইস্যুতে আন্দোলনে নামে। মূলত একটি পক্ষ বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তাদেরকে দিয়ে আন্দোলন করাচ্ছে। যারা চাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ না হোক। ”
এ বিষয়ে এক ফেসবুক পোস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী সাবেক সহ-সমন্বয়ক তানভির মন্ডল বলেন, “সাজিদ আব্দুল্লাহকে আর ট্রাম্পকার্ড বানানো উচিত নয়। কেন ট্রাম্পকার্ড বললাম? তার কারণ, সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যার বিচারের দাবিতে বেশ কয়েকটি আন্দোলন হয়েছে বিশেষ কিছু দিনে—যেমন নিয়োগ বোর্ডের আগের দিন বা বোর্ডের দিন।
তিনি আরো বলেন, বলি কি, সিন্ডিকেটের দিনে বা নিয়োগ বোর্ডের আগে, বিশেষ আশায় এই ধরনের আন্দোলন করত স্বৈরশাসক হাসিনার পেটোয়া বাহিনী, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ। এজন্য আমি বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করছি, এসব ধারাবাহিকতা ছেড়ে প্রকৃতভাবে বিচার চাইলে সেটা চাওয়া উচিত বিচারের জন্য উপযুক্ত সময়ে, বিশেষ দিনে নয়।”
অভিযোগের বিষয়ে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী বোরহান কবির বলেন, “আমার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। ছাত্রসংগঠনগুলো প্রোগ্রাম করলে রাজনীতি বলা হয় না, কিন্তু আমরা করলে কেন রাজনীতি হবে? সাজিদ ইস্যুতে আমি যতগুলো প্রোগ্রাম করেছি, সবই করেছি সব ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে। এখন যদি প্রশাসনের নিয়োগ বোর্ডের সময়ের সঙ্গে এগুলো মিলে যায়, তার দায় কি আমার? আমরা সাজিদকে কোনো রাজনৈতিক ট্রামকার্ড হিসেবে ব্যবহার করছি না। এই অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। কেউ হয়তো ব্যক্তিগত ধারণা থেকে এসব বলছে।”
এদিকে সাজিদের মৃত্যুর পর তার নিজ বিভাগ আল কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রসংগঠনের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল আল কুরআন বিভাগের। শুরুতে তারা কয়েকটি কর্মসূচি পালন করলেও পরবর্তীতে তারা আর আন্দোলন করেনি। এতে আন্দোলনও স্থবির হয়ে পড়ে। ফলে সাজিদ ইস্যুতে সমন্বিত আন্দোলন ভেঙে যায় এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পক্ষ পৃথক পৃথক কর্মসূচি পালন করতে শুরু করে।
এ বিষয়ে আল কুরআন বিভাগের সভাপতি নাসির উদ্দিন মিঝি বলেন, “পুলিশ প্রশাসন আমাদের বলেছে, বিষয়টি তারা হ্যান্ডেল করছে, আমাদের লাফালাফি করার দরকার নেই। সেই কারণেই আল কুরআন বিভাগের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে আর বড় কোনো আন্দোলন হয়নি।”
এসব সিলেকটিভ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের বিষয়ে জানতে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অংশগ্রহণের বিষয়ে শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইউসুফ আলী বলেন, “আমাদের আমন্ত্রণ জানাত, তাই আমরাও অংশ নিতাম। তাছাড়া সাজিদের হত্যার বিচার আমরা সবাই চাই। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে যেকোনো কর্মসূচিতেই আমরা যেতে পারি। এখন কার কী উদ্দেশ্য, সেটা তো আমরা জানি না।”
ছাত্র আন্দোলন ইবি শাখার সভাপতি ইসমাইল হোসেন রাহাত বলেন, “সাজিদ ইস্যুতে আমরা অনড়। তাই এই ইস্যুতে হওয়া যেকোনো আন্দোলনেই আমরা অংশ নিয়েছিÑ হোক তা আমন্ত্রণে বা আমন্ত্রণ ছাড়া। এখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকলে তা তো আমরা জানি না। ”
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
ক্যাম্পাস এর সর্বশেষ খবর