ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে একের পর এক সংঘর্ষ ও সহিংসতায় নিহত ও আহতের সংখ্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে, বহু হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। চিকিৎসক ও হাসপাতালকর্মীরা আহতদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে চরম চাপের মুখে পড়েছেন।
সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ১০৯ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং বাকিরা বিক্ষোভকারী।
হাসপাতালে লাশের স্তূপ, গুলিবিদ্ধ তরুণদের ভিড়
বিক্ষোভ জোরদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি চালানোর ঘটনাও বেড়েছে। তেহরানের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন সাময়িকী টাইম–কে জানান, রাজধানীর মাত্র ছয়টি হাসপাতালে কমপক্ষে ২১৭ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর রেকর্ড রয়েছে। তাঁদের অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, সরকার দাবি করছে—বিক্ষোভে অন্তত ১০৯ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন।
তিনটি হাসপাতালের চিকিৎসকরা বিবিসিকে জানান, সংঘাত-সহিংসতায় আহত ও নিহতদের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অধিকাংশ আহতের শরীরে গুলির ক্ষত রয়েছে। অনেক তরুণের মাথা ও বুকে সরাসরি গুলি লেগেছে বলেও জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার হুঁশিয়ারি
ইরানে বিক্ষোভ দমনে সহিংসতার জবাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ইরানিরা এখন স্বাধীনতা চায় এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহায়তায় প্রস্তুত।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর বরাতে নিউ ইয়র্ক পোস্ট জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক হামলার প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরি করছে। বিবেচনায় রয়েছে ইরানের একাধিক সামরিক ঘাঁটিতে বড় আকারের বিমান হামলা চালানোর বিকল্প। যদিও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে ইসরাইল সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে নেতানিয়াহুর ফোনালাপ হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ইরানের পালটা হুমকি
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ইসরাইলকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে ইরানের পার্লামেন্টে জানিয়েছেন স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেন, কয়েক লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বিক্ষোভের মুখে সরকার পিছু হটবে না। যুক্তরাষ্ট্রের মদদেই এই বিক্ষোভ ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ ঘোষণা দিয়েছেন, শতাধিক শহরে চলমান বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের ‘সৃষ্টিকর্তার শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং এ অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
বিক্ষোভের সূচনা যেভাবে
দুই সপ্তাহ আগে ইরানের তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, ডলারের বিপরীতে মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের ডাকা কর্মসূচি থেকে শুরু হয় এই বিক্ষোভ। শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও ধীরে ধীরে তা সহিংস রূপ নেয়।
২০২২ সালে পুলিশ হেফাজতে কুর্দি নারী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর যে আন্দোলন হয়েছিল, তার পর এই বিক্ষোভকেই কয়েক দশকের মধ্যে ইরানের সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর