নিরাপত্তাজনিত কারণে মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর থেকেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একজন বাংলাদেশি পেসারই যদি নিরাপদ না থাকেন, তাহলে পুরো দল কীভাবে নিরাপত্তা পাবে—এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এই প্রেক্ষাপটে ভারত থেকে বিশ্বকাপের ম্যাচ সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আইসিসির কাছে একাধিক চিঠি পাঠিয়েছে সংস্থাটি।
সবশেষে আইসিসির নিরাপত্তা বিভাগ বাংলাদেশের ভারত বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে ‘তিনটি আশঙ্কা’র কথা উল্লেখ করে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। সেই চিঠির একটি কপি পেয়েছে বিবিসি বাংলা, যারা এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে আইসিসির ইমেইলে কী বলা হয়েছে, তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
আইসিসির মেইলের শুরুতে ৩ জানুয়ারি নিরাপত্তাজনিত কারণে মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দিতে বিসিসিআইয়ের নির্দেশনা, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারত নয়—শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ আয়োজনের দাবি এবং মুস্তাফিজ ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধ হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর চারটি পৃথক বিষয়ের আলোকে বাংলাদেশের ভারত সফরকে ঘিরে সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়।
এদিকে ক্রিকেটবিষয়ক ওয়েবসাইট ইএসপিএনক্রিকইনফো জানিয়েছে, এই ‘রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’ আসলে আইসিসির একটি সার্বজনীন মানদণ্ডভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস, যেখানে সাধারণত শুধু এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে ম্যাচের ভেন্যু পরিবর্তনের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না।
১. মুস্তাফিজ ইস্যু
ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আয়োজনের ঝুঁকি পর্যালোচনা সম্পন্ন হয়েছে ডিসেম্বরে এবং পুরো আসর ঘিরে ঝুঁকির মাত্রা ‘মডারেট’ বা মাঝারি মাত্রার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের জন্য এই ঝুঁকির মাত্রা ‘মডারেট টু হাই’বা মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার বলে জানানো হয়েছে মেইলে।
অর্থাৎ, অন্যান্য দলের জন্য ঝুঁকির মাত্রা মাঝারি হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার বলে উঠে আসে ওই মূল্যায়নে।
সেই প্রাথমিক মূল্যায়নের পর বাংলাদেশ দলের ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করতে আরেক দফায় ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়, যেখানে বাংলাদেশ দলের জন্যও মাঝারি মাত্রার ঝুঁকি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এর সঙ্গে যোগ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ দলের সঙ্গে মুস্তাফিজের উপস্থিতি সমস্যার কারণ হতে পারে যদি ‘ধর্মীয় উগ্রপন্থার বিষয়টি জড়িত হয়।’
২. বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা ইস্যু
বেঙ্গালুরুতে ওয়ার্ম আপ ম্যাচের পাশাপাশি কোলকাতায় তিনটি ও মুম্বাইয়ে একটি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ খেলার কথা রয়েছে বাংলাদেশের।
ম্যাচের সময় ও প্রতিপক্ষ বিবেচনায় এসব ম্যাচে বাংলাদেশ দলের ঝুঁকি ‘মিডিয়াম-লো’ বা মাঝারি থেকে কম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেখানে ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের একজন কর্মকর্তা সি ভি মুরালিধরের একটি মূল্যায়নের উল্লেখও করা হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছেন যে সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে ঝুঁকির মূল্যায়ন পরিবর্তন হয়নি এবং তিনি আত্মবিশ্বাসী যে এমন কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হবে না যা আসরের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী নিরসন করা যাবে না।
৩. সমর্থকদের নিরাপত্তা ইস্যু
ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ইতিহাস ও নিশ্চয়তার ভিত্তিতে মেইলে উল্লেখ করা হয়েছে যে বাংলাদেশ দল বা অন্য কোনো অংশগ্রহণকারী দল কোলকাতা বা মুম্বাইয়ে বড় ধরনের সহিংসতার শিকার হবে বা হঠাৎ তাদের জন্য ঝুঁকির মাত্রা বৃদ্ধি পাবে, এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
এই দুই ভেন্যুর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দলের ঝুঁকি মাঝারি মাত্রার বলে উল্লেখ করা হয়েছে মেইলে।
তবে এই দুই জায়গায় বাংলাদেশি সমর্থকদের - বিশেষ করে যারা দলের জার্সি পরে বা আলাদা ছোট দলে স্টেডিয়ামে যাবেন - ঝুঁকির মাত্রা মাঝারি থেকে উচ্চ পর্যায়ের বলে উঠে এসেছে বিশ্লেষণে।
পাশাপাশি, বিশ্বকাপ আসর ঘিরে যদি কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটে তাহলে তা আশেপাশের বড় এলাকা জুড়ে সহিংসতা ও বিক্ষোভ তৈরি করতে পারে।
ওই প্রতিবেদনে উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা হয় যে মসজিদ পোড়ানো, বড় ধরনের দাঙ্গা বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হত্যার মত ঘটনা দুই দেশের কোনো একটি দেশে ঘটলে উত্তেজনা বাড়তে পারে এবং তা দলের জন্য ঝুঁকির মাত্রা বৃদ্ধি করবে।
এই ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কম থাকলেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলে উঠে এসেছে মেইলে।
৪. বাংলাদেশের নির্বাচন ইস্যু
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাব—বিশেষ করে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে—পুরো অঞ্চলে স্বল্প থেকে মাঝারি মেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আইসিসির ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই উত্তেজনা খেলার ভেন্যুতে বা খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আশঙ্কা নেই বলেও মেইলে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ দল ও তাদের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ঝুঁকি এই মুহূর্তে ‘মাঝারি’ পর্যায়ের বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ ছাড়া নির্ধারিত ভেন্যুগুলোতে বাংলাদেশ দলের জন্য প্রণীত নিরাপত্তা পরিকল্পনার একটি ‘ফুল রিভিউ’ বা পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করার প্রয়োজনীয়তার কথাও ঝুঁকি মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
মেইলের শেষাংশে জানানো হয়েছে, কৌশলগত নিরাপত্তা পরিকল্পনাটি বর্তমানে দুই বোর্ডের মনোনীত দুজন স্বাধীন নিরাপত্তা ব্যবস্থাপকের কাছে পর্যালোচনার জন্য রয়েছে।
সবশেষে বিসিবির নিরাপত্তা উপদেষ্টার উদ্দেশে বলা হয়েছে, এই বিষয়ে তার মূল্যায়ন ও মন্তব্যকে স্বাগত জানানো হবে, যাতে বিসিবির দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো ঝুঁকি বা উদ্বেগ থাকলে তা সমন্বিতভাবে সমাধান করা সম্ভব হয়।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
স্পোর্টস এর সর্বশেষ খবর