বিয়ে মূলত দু’জন মানুষের মধ্যে আজীবনের একটি অঙ্গীকার, যেখানে পারস্পরিক ভালো থাকা, বোঝাপড়া ও দায়িত্ববোধ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংসার টিকিয়ে রাখতে বয়সের ব্যবধান কতটা জরুরি—এ নিয়ে সমাজে নানা মতভেদ রয়েছে। তবে সম্পর্কের সাফল্য নির্ভর করে বয়সের চেয়ে অনেক বেশি ভালোবাসা, সম্মান, অভিন্ন মূল্যবোধ, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং একে অপরের প্রতি সমর্থনের ওপর। বয়সের পার্থক্য বড় বা ছোট হওয়াই সমস্যা নয়, বরং সেই পার্থক্যকে দু’জন কীভাবে সামলাচ্ছেন, সেটাই আসল বিষয়।
অনেকে মনে করেন, সমবয়সী বিয়ে সুখকর নয়; আবার কারও মতে, আধুনিক যুগে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বেশি বয়সের ব্যবধানও শোভনীয় নয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়সের ব্যবধানের পেছনে জৈবিক, শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক নানা কারণ কাজ করে। বয়স মানুষের ব্যক্তিত্ব ও পরিপক্বতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। যদিও এর ব্যতিক্রম যে নেই, তা নয়—অনেক ক্ষেত্রেই বয়সের ব্যবধান সত্ত্বেও সম্পর্ক সফলভাবে টিকে থাকে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, বিয়েতে সমবয়সী না বয়সের ব্যবধান—কোন সম্পর্ক বেশি স্থায়ী?
বিয়েতে বয়সের ব্যবধান কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বয়সের পার্থক্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে বিচ্ছেদের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। গবেষণা অনুযায়ী, সমবয়সী বা এক বছরের কম পার্থক্যের দম্পতিরা তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিতে থাকেন এবং তাদের দাম্পত্য সন্তুষ্টি ও স্থায়িত্ব বেশি দেখা যায়।
অন্যদিকে, পাঁচ বছরের বয়সের ব্যবধানে বিচ্ছেদের সম্ভাবনা কিছুটা বাড়ে, কারণ জীবনের লক্ষ্য ও পরিকল্পনায় সমন্বয় করতে গিয়ে চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। দশ বছর বা তার বেশি পার্থক্যে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে। চাকরি, সামাজিক দায়িত্ব, পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের প্রত্যাশা এবং আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা—সব মিলিয়ে চাপের মাত্রা বেড়ে যায়। আর ২০ থেকে ৩০ বছরের বয়সের ব্যবধান থাকলে দাম্পত্য সম্পর্কে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হতে পারে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বয়স ব্যবধানে শুরুতেই ভালো লাগা ও দীর্ঘমেয়াদি আনন্দ একই জিনিস নয়। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শুরুতে বড় বয়সে পার্থক্য থাকা দম্পতিরা বেশ সন্তুষ্টি অনুভব করেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আনন্দ কমতে শুরু করে। বিশেষত বড় পার্থক্য থাকলে সময়ের চাপ, জীবনধারা মিল এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে চাপটা বেড়ে যায়। সেটা কিছু ক্ষেত্রে বিচ্ছেদের প্রবণতা বাড়ায়।
তাহলে সমবয়সী হওয়া কি সমাধান?
গবেষণা বলছে, সমবয়সী বা খুব কম পার্থক্য থাকা সম্পর্কগুলো সাধারণভাবে স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ভালো পারফর্ম করে। সমবয়সী হওয়ায় একে অপরের জীবন ধারা, প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া ভালো হয়, বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং চ্যালেঞ্জগুলো একসঙ্গে মোকাবিলা করা সহজ হয়। আবার অনেক সময় নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব বা জেদাজেদি বেশি হলে তা সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে, যা গবেষণায়ও উঠে এসেছে ।
সর্বোপরি, বিয়ের আগে মন খুলে কথা বলা উচিত। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, জীবনলক্ষ্য ও পারিবারিক দায়িত্ব নিয়ে দুজনের মত জেনে নিতে হবে। বয়স পার্থক্য থাকলে এক-অপরের মানসিক অবস্থান ও অগ্রাধিকার বুঝে নিতে হবে। সাধারণ সামাজিক ধ্যান-ধারণার চেয়ে উভয়ের মানসিক মিল ও প্রস্তুতির দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। সব শেষে সম্পর্কের স্থিতিশীলতা শুধু বয়সের ওপর না নির্ভর করে, বরং বোঝাপড়া, সম্মান, মূল্যবোধ মিল, জীবনলক্ষ্য মিল এবং যোগাযোগের উপর।
তবে মনে রাখতে হবে, এগুলো অবশ্যই গড়-ধারণা এবং ব্যক্তিগত জীবন এবং সম্পর্কের বাস্তবতা আলাদা হতে পারে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর