রাত গভীর হলে অজান্তেই ফোনের দিকে মনোযোগ চলে যাওয়া, কখনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ বোলানো, কখনও ভিডিও দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়া- এসব নতুন যুগের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
তবে এই অভ্যাস যে ঘুম, মন এবং প্রতিদিনের জীবনকে প্রভাবিত করে তা বুঝে ওঠার সময়ও পাওয়া যায় না।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন- শোবার ঘর থেকে ফোন সরিয়ে রাখার মতো একটি ছোট সিদ্ধান্ত বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
অনেকেই মনে করেন, ঘুম না এলে ফোনে কিছু দেখা বা স্ক্রল করা মনকে শান্ত করে।
তবে ঘুমবিষয়ক মার্কিন মনোবিজ্ঞানী সারা গ্রে রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করেন, রাতের অল্প আলোও শরীরের স্বাভাবিক হরমোনের উৎপাদনকে ব্যাহত করতে পারে। এই হরমোন ঘুমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ফোনের আলো চোখে পড়লে ঘুম আসতে দেরি হয়, ঘুম ভেঙে যায় বা গভীর ঘুম নষ্ট হয়।
তিনি আরও বলেন, ফোনে স্ক্রল করতে করতে মনে হতে পারে আরাম পাচ্ছি। তবে বাস্তবে মস্তিষ্ক তখনও সক্রিয় থাকে। অর্থাৎ, শরীর ক্লান্ত হলেও মস্তিষ্ক বিশ্রাম নিতে পারে না। ফলে ঘুমের মান কমে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব এবং মানসিক চাপ বাড়ায়।
একঘেয়েমি থেকে শুরু, তারপর নতুন অভ্যাস
শোবার ঘরে ফোন না রাখার সিদ্ধান্ত প্রথম দিকে সহজ মনে হবে না। প্রথম কয়েকদিন একঘেয়েমি ও অস্বস্তি কাজ করতে পারে। কারণ অভ্যাসগতভাবে ফোনকে রাতের সঙ্গী বানিয়ে ফেলা হয়। তবে ধীরে ধীরে বিকল্প কিছু অভ্যাস তৈরি করা গেলে এই অস্বস্তি কমে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমানোর আগে এমন কিছু করা উচিত যা মনকে শান্ত করে।
যেমন- বই পড়া, হালকা সৃজনশীল কাজ করা, গান শোনা বা গরম পানিতে গোসল করা।
এসব কাজ মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে বিশ্রামের দিকে নিয়ে যায়, যা স্বাভাবিক ঘুমকে সহজ করে।
সকালে ফোন না ধরার সুফল
ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নেওয়া অনেকের অভ্যাস। আবার খবর, বার্তা বা অন্যান্য তথ্য দেখে দিন শুরু করেন কেউ কেউ। তবে এটি দিনের শুরুতেই মস্তিষ্ককে চাপের মধ্যে ফেলে দেয়।
সারা গ্রে বলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন দেখলে মস্তিষ্ক হঠাৎ করেই সক্রিয় হয়ে যায়। এতে দিনের শুরুটা স্বাভাবিকভাবে ধীরে ধীরে হওয়ার সুযোগ পায় না।
ফোন ছাড়া সকাল শুরু করলে দিনটি অনেক শান্তভাবে শুরু হয়। মন সতেজ থাকে, নিজের জন্য সময় পাওয়া যায় এবং দিনের কাজগুলো পরিকল্পিতভাবে শুরু করা যায়।
এতে ধীরে ধীরে ফোন দেখার তাড়না কমে যায় এবং দিনজুড়ে ফোনের ওপর নির্ভরতা কমে।
ফোনমুক্ত শোবার ঘর: শুধু ঘুম নয়, বদলে দেয় অভ্যাস
শুধু ঘুমের উন্নতিই নয়, শোবার ঘর থেকে ফোন সরিয়ে রাখার ফলে জীবনের আরও অনেক পরিবর্তন আসে।
যেমন- মনোযোগ বাড়ে, কাজের দক্ষতা বাড়ে এবং নিজের শখ বা আগ্রহের দিকে সময় দেওয়া যায়।
রাতে ফোন ব্যবহার বন্ধ করার পর, দিনের বেলাতেও ফোন ব্যবহারের সময় কমে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। অর্থাৎ, একটি ছোট সীমারেখা তৈরি করার ফলে পুরো জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
এই বিজ্ঞানীর মতে, এটি আসলে অভ্যাস পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া। যখন একটি নির্দিষ্ট জায়গায় একটি অভ্যাস বন্ধ করা হয়, তখন ধীরে ধীরে সেই অভ্যাস অন্যান্য ক্ষেত্রেও কমে যায়। এতে নতুন, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে ওঠে।
যেভাবে শুরু করা যায়
শোবার ঘরকে ফোনমুক্ত করতে চাইলে প্রথমেই একটি নির্দিষ্ট জায়গা ঠিক করতে হবে, যেখানে রাতে ফোন রাখা হবে। এটি হতে পারে ঘরের বাইরে কোনো টেবিল বা অন্য একটি কক্ষ। পাশাপাশি ঘুম থেকে ওঠার জন্য আলাদা অ্যালার্ম ঘড়ি ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্রথম দিকে কিছুটা অস্বস্তি হওয়া স্বাভাবিক। তবে ধীরে ধীরে এটি অভ্যাসে পরিণত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজেকে সময় দেওয়া এবং ধৈর্য রাখা।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর