চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলা, পাঁচলাইশ ও চান্দগাঁওয়ের ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে এলাকা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৮ আসনে জাতীয় নির্বাচনের রাজনীতি এখন অনিশ্চয়তায় ভরা। বড় দুই বিরোধী শক্তি বিএনপি ও জামায়াতের মাঠপর্যায়ের অবস্থান ও কৌশল আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। উভয় দলই সাংগঠনিক চাপে থাকলেও, ভোটের হিসাব বলছে— যে দল মাঠে বেশি সময় দেবে এবং স্থানীয় ইস্যুতে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে পারবে, তার ভোটের পাল্লা ভারী হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে জামায়াত চট্টগ্রাম-৮ আসনে নির্বাচন মাথায় রেখে কাজ করেছে এবং চট্টগ্রামের খ্যাতিমান এক চিকিৎসক নেতাকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, বিএনপি থেকে প্রার্থী মনোনয়নে সিদ্ধান্ত আসতে দেরি হলেও, শেষমেশ চট্টগ্রাম নগর বিএনপির আহ্বায়কের উপর ভরসা করেছে কেন্দ্র। এরশাদ উল্লাহ (বিএনপি) এবং ডা. আবু নাসের (জামায়াত) এরই মধ্যে প্রচারণার মাধ্যমে নির্বাচনী উত্তাপ ছড়িয়েছেন।
সম্প্রতি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের খেলায় এই আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নজর দিয়েছে। ভোটের মাঠে কোনো শক্ত অবস্থান না থাকলেও, এনসিপিও সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগ করছে। কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক জোবাইরুল হাসান আরিফকে মাঠে দেখা যাচ্ছে। তবে তার বাড়ি এই আসনে না হওয়ায়, তাকে নতুন রাজনৈতিক মুখ হিসেবে ভোটারদের কাছে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে। বিএনপির অবস্থান এই আসনে আগে থেকে ভালো হলেও, জামায়াত গত দেড় বছর ধরে নিজেদের উর্বরতা বাড়িয়েছে। প্রার্থী নির্বাচনে বিএনপির গড়িমসি ও সময়ক্ষেপণ জামায়াতকে অনেকটা সুবিধা করে দিয়েছে। চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতি এবং দেড় বছরের দীর্ঘ প্রচারণার কারণে জামায়াত প্রার্থী ভোটের মাঠে পাকাপোক্ত ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। পাঁচলাইশ-চান্দগাঁও-বোয়ালখালীতে জামায়াতের একটি স্থায়ী ভোটব্যাংক রয়েছে, যা মূলত মসজিদ-মাদ্রাসাভিত্তিক এবং স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে জামায়াত বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প, ত্রাণ বিতরণসহ নানামুখী প্রচারণার কাজ করেছে।
তবে জোটের খেলায় জামায়াত যদি এই আসন এনসিপিকে ছেড়ে দেয়, তাহলে কপাল খুলে যাবে বিএনপি প্রার্থীর। এ পরিস্থিতিতে বিএনপি অনেকটা নিশ্চিন্তেই তাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এনসিপির পক্ষ থেকে জামায়াতের উপর এই চাপ রয়েছে বলে জানা গেছে।
সীমানা পরিবর্তনের পর ২০০৮ সাল থেকে এই আসনে টানা ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থী। দেশের বৃহত্তম এই দলটি এবার নির্বাচনী মাঠে নেই। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হলেও, জামায়াতের প্রভাবও এখানে রয়েছে। চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপি থেকে লড়বেন বর্তমান নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ। জামায়াতের প্রার্থী ডা. আবু নাসের। পাশাপাশি মাঠে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক জোবাইরুল হাসান আরিফকেও দেখা যাচ্ছে।
তবে বিএনপিতে দলীয় কোন্দল ও অসন্তোষ রয়েছে এ আসন ঘিরে। প্রার্থী ঘোষণার পর কোন্দল আরও বেশি সামনে এসেছে। এখানে সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য এম মোর্শেদ খান, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান এবং বর্তমান নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ— এই তিনজনের গ্রুপিংয়ে বিএনপির ভোটাররা ঘুরপাক খাচ্ছেন। এই গ্রুপিং জিইয়ে থাকলে বিএনপির এই আসন পুনরুদ্ধার করা কষ্টসাধ্য হবে।
এই আসনের রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিএনপি এখনো এই আসনে একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি। গ্রুপিংয়ের রাজনীতি বাদ দিয়ে এক হয়ে গেলে বিএনপির জয়কে ঠেকানো অসম্ভব।
চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ বলেন, "আমরা জনগণের কল্যাণে রাজনীতি করি। জনকল্যাণমুখী কাজ করেছি। বিভিন্ন সময়ে এলাকার গরিব অসহায়দের মাঝে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম করেছি। ঈদে-কোরবানে ইফতার সামগ্রী ও গোস্ত বিতরণ করেছি। জনগণের মাঝে ধানের শীষের গণজোয়ার দেখতে পাচ্ছি। গ্রামের মানুষের মাঝে গণসংযোগে গিয়ে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।"
চট্টগ্রাম-৮ আসনের জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ডা. আবু নাসের বলেন, "আমি গ্রামে গঞ্জে, শহরে নগরে, ঘরে ঘরে সবার সাথে যোগাযোগ করছি। আলহামদুলিল্লাহ, ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। আমি এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসা খাতের উন্নয়নে কাজ করছি। কলকারখানা প্রতিষ্ঠা, নারী শ্রমিকদের বেতন বৈষম্য দূরীকরণ, বেকার সমস্যা রোধ, মাদক সমস্যা দূরীকরণ সহ বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে প্রায়োরিটি বেসিসে কাজ করছি এবং সামনে নির্বাচিত হই বা না হই কাজ করে যাবো। পেশায় ডাক্তার হিসেবে অসংখ্য রোগীকে ফ্রি চিকিৎসা দিয়েছি এবং চিকিৎসা খরচ কমিয়ে দিয়েছি। বোয়ালখালীর লোকজন দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে বলে আমি আশাবাদী।"
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম-৮ আসনের এনসিপি মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ও চট্টগ্রাম অঞ্চল তত্ত্বাবধায়ক জোবাইরুল হাসান আরিফের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর