কিছু বিদায় থাকে, যা শুধু একটি চাকরির ইতি নয়—তা হয়ে ওঠে ভালোবাসা, স্মৃতি আর আবেগে ভরা এক জীবনের অধ্যায়। তেমনই এক হৃদয়বিদারক বিদায়ের সাক্ষী হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া পৌর শহরের দেবগ্রাম সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়।
দীর্ঘ ৩৪ বছর শিক্ষকতা শেষে অবসরে গেলেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ মো. মাহফুজুর রহমান। প্রিয় এই শিক্ষককে বিদায় জানাতে বৃহস্পতিবার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমধর্মী রাজকীয় বিদায় সংবর্ধনার।
অন্য দিনের মতোই সকাল সাড়ে ৯টায় বিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন শেখ মাহফুজুর রহমান। কিন্তু এদিন ছিল ব্যতিক্রম। শ্রেণিকক্ষে কোনো ক্লাস নেই, পুরো বিদ্যালয়জুড়ে শুধুই আবেগ আর ভালোবাসার ঢেউ। বিদ্যালয় মাঠ সাজানো হয় রঙিন ডেকোরেশনে। সহকর্মীরা কেউ হাতে ফুল, কেউ ক্রেস্ট, কেউ উপহার নিয়ে দাঁড়িয়ে—প্রিয় শিক্ষককে শেষবারের মতো সম্মান জানাতে।
বেলা ১০টা ৪৫ মিনিটে বিদায়ী প্রধান শিক্ষকের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা শুরু হয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে আবেগঘন। বক্তব্য দিতে গিয়ে অনেকেই স্মৃতিচারণে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর কুমিল্লা অঞ্চলের উপ-পরিচালক মো. আরিফুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জেলা শিক্ষা অফিসার মো. জুলফিকার হোসেন। এছাড়াও বক্তব্য দেন বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. আমিনুল ইসলাম, শিক্ষক অলক কুমার চক্রবর্তী, মো. শাহাদাত হোসেন, সাবেক কাউন্সিলর মো. বাবুল সর্দার, বিদ্যালয়ের সাবেক সহ-সভাপতি শেখ মো. আইয়ুবুর রহমান, অধ্যাপক মো. জাবেদ আহমদ খানসহ অন্যান্যরা।
অনুষ্ঠান শেষে এক আবেগঘন মুহূর্তে ফুলে সাজানো গাড়িতে করে শেখ মাহফুজুর রহমানকে রাজকীয় বিদায়ে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়। গাড়ির পিছু পিছু অশ্রুসিক্ত চোখে হাঁটতে দেখা যায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের—যেন প্রিয় অভিভাবককে শেষবারের মতো বিদায় জানাচ্ছেন তারা।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, দেবগ্রাম শেখ বাড়ির মৃত ধন মিয়ার ছেলে শেখ মো. মাহফুজুর রহমান চাকরির শুরু থেকেই একই বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ ৩৪ বছর সততা, নিষ্ঠা ও ভালোবাসা দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানকে আপন করে নিয়েছিলেন। অবসরও নিলেন সেই বিদ্যালয় থেকেই, যেখানে কেটেছে তার জীবনের সেরা সময়গুলো।
সহকর্মীরা বলেন, শেখ মাহফুজুর রহমান ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল, সদালাপী ও শিক্ষার্থীবান্ধব একজন শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন কেবল একজন শিক্ষক নন—একজন অভিভাবক, পথপ্রদর্শক ও নির্ভরতার মানুষ।
বিদায়ী অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে শেখ মো. মাহফুজুর রহমানের। তিনি বলেন,
“বিদায় বিষয়টা আসলেই খুব কষ্টের। যার বিদায় দেওয়া হয়, সেই বোঝে এই ব্যথা কতটা গভীর। সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের রেখে চলে যাওয়া খুবই কঠিন। ৩৪ বছর এক জায়গায় থেকেছি—এই বিদ্যালয় আমার পরিবার হয়ে গেছে। আজ যে সম্মান ও ভালোবাসা পেলাম, তা আমৃত্যু হৃদয়ে ধারণ করে রাখবো।”
এই বিদায়ের মধ্য দিয়ে দেবগ্রাম সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় হারাল একজন প্রধান শিক্ষককে—কিন্তু রয়ে গেল একজন মানুষের অমলিন স্মৃতি, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার ইতিহাস।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর