ইরানের সাম্প্রতিক সহিংস দাঙ্গার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। একই সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, দাঙ্গার পরপরই লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজিত সমাবেশ ইরানের “বাস্তব পরিস্থিতি” স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) টেলিফোনে দুই নেতার মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ফোনালাপে পেজেশকিয়ান দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সর্বশেষ হালনাগাদ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে পরিকল্পিতভাবে ছিনতাই করে সংগঠিত সহিংসতায় রূপ দেওয়া হয়েছে। এই সহিংসতার পেছনে বিদেশি শক্তির মদদ ছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ নীতি পুরোপুরি জনগণকেন্দ্রিক এবং জনগণের ন্যায্য দাবিগুলো শোনা ও নিষ্ঠুর নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলো লাঘব করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত ব্যাপক ও ঐতিহাসিক সমাবেশের মাধ্যমে দাঙ্গাকারীদের সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে এবং মিলিয়ন মানুষের উপস্থিতিতে ইরানি জাতি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়েছে।
আলোচনায় জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ইরানের পক্ষে রাশিয়ার সমর্থনমূলক অবস্থানের জন্য মস্কোকে ধন্যবাদ জানান পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি খাতে তেহরান ও মস্কোর সহযোগিতা খুবই ভালো পর্যায়ে রয়েছে। ইরান–রাশিয়ার যৌথ প্রকল্পগুলো উচ্চ মান বজায় রেখে এগোচ্ছে এবং সেগুলোর বাস্তবায়ন নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, মস্কো ইরানের পরিস্থিতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি সাম্প্রতিক অস্থিরতাকে “কালার রেভল্যুশন”-এর দৃশ্যপটের সঙ্গে তুলনা করেন এবং স্বীকার করেন, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ বাড়িয়েছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, দাঙ্গা ও সহিংস বিশৃঙ্খলার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও নাগরিক প্রতিবাদের কোনো সম্পর্ক নেই।
রাষ্ট্রীয়, জনসাধারণের ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা এবং নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর সহিংস আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানান পুতিন। তার মতে, এসব কর্মকাণ্ড বিদেশি মদদে সংঘটিত হয়েছে এবং ইরানের শাসনব্যবস্থা ও সরকারের পক্ষে মিলিয়ন মানুষের সমাবেশ দেশটির প্রকৃত পরিস্থিতিই প্রতিফলিত করে।
পুতিন আরও বলেন, ইরান সরকারের নেওয়া অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলো পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে বলে তিনি আশা করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বৃদ্ধি ঠেকাতে এবং ইরানের অবস্থান স্পষ্ট করতে রাশিয়ার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান। তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণে মস্কো আগ্রহী উল্লেখ করে তিনি বলেন, যৌথ প্রকল্পগুলো সন্তোষজনকভাবে এগোচ্ছে এবং দুই দেশের যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের আসন্ন বৈঠকে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসবে।
এদিকে ক্রেমলিন জানায়, আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে রাশিয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে একই দিনে পুতিন আলাদাভাবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও কথা বলেন। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, পরিস্থিতি এখনো চরম উত্তেজনাপূর্ণ এবং মস্কো উত্তেজনা প্রশমনে সক্রিয় যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, ইরানে অস্থিরতার সূত্রপাত হয় মুদ্রার অস্থিরতা ও লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতিকে কেন্দ্র করে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বেআইনি নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করে তেহরান। গত ৮ জানুয়ারি পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়, যখন সমন্বিত হামলায় সরকারি, জনসাধারণের ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দোকান, ব্যাংক, বাসস্ট্যান্ড ও মসজিদে হামলা চালায়, এতে একাধিক নিরাপত্তাকর্মী ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রমাণে দেখা গেছে বিদেশি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র বিতরণ করেছে এবং এসব কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর