মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বাড়তে থাকায় নৌ ও বিমান বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধসম্পদ পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, একটি শক্তিশালী মার্কিন “নৌবহর (আর্মাডা)” উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, একটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপসহ নৌ ও বিমান বাহিনীর একাধিক যুদ্ধসম্পদ আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাবে। এর মধ্যে রয়েছে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার, যা এক সপ্তাহেরও বেশি আগে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে গতিপথ পরিবর্তন করে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাত্রা শুরু করেছে।
কী বললেন ট্রাম্প
ট্রাম্প বলেন, “আমরা ইরানকে নজরে রাখছি। আমাদের একটি বড় শক্তি ইরানের দিকে যাচ্ছে। হয়তো সেটি ব্যবহারই করতে হবে না। তবে প্রয়োজন হলে প্রস্তুত থাকতে চাই।” তিনি আরও জানান, পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কী কী যুদ্ধসম্পদ যাচ্ছে
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের সঙ্গে থাকা আরলি বার্ক শ্রেণির ডেস্ট্রয়ারগুলো টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত, যা ইরানের ভেতরে গভীর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। পাশাপাশি এসব জাহাজে রয়েছে এজিস কমব্যাট সিস্টেম, যা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রসহ আকাশপথের হুমকি প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়।
এর আগে গত জুন মাসে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতির পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। সে সময় সাবমেরিন থেকে ৩০টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং বি-২ বোমারু বিমান ব্যবহার করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি
যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে অঞ্চলটিতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ১৯টি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে।
ইরানের হুঁশিয়ারি
ইরান এই সামরিক তৎপরতাকে সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছে। দেশটির সশস্ত্র বাহিনী ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সমন্বয়কারী কমান্ডার আলি আবদোল্লাহি আলিয়াবাদি সতর্ক করে বলেন, “ইরানের ওপর কোনো সামরিক হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা সব মার্কিন ঘাঁটি বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।”
বিপ্লবী গার্ডের প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর বলেন, “আমরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রস্তুত। আঙুল ট্রিগারে।” তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে “ভুল হিসাব না করার” আহ্বান জানান।
আকাশপথেও প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনার প্রভাবে আকাশ চলাচলেও প্রভাব পড়ছে। এয়ার ফ্রান্স প্যারিস–দুবাই রুটে কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল করে পরে আবার চালু করেছে। লুক্সএয়ার লুক্সেমবার্গ–দুবাই ফ্লাইট ২৪ ঘণ্টা পিছিয়েছে। কেএলএম ও ট্রান্সাভিয়ার কিছু ফ্লাইটও বাতিল হয়েছে।
নতুন নিষেধাজ্ঞা
ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ৯টি জাহাজ ও তাদের মালিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। অভিযোগ, এসব জাহাজ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শত শত মিলিয়ন ডলারের ইরানি তেল বিদেশে পাচার করেছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, “এই নিষেধাজ্ঞা ইরানের সেই অর্থের উৎসকে লক্ষ্য করে, যা দিয়ে তারা নিজেদের জনগণের ওপর দমন–পীড়ন চালায়।”
মানবাধিকার প্রসঙ্গ
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। ইরান দাবি করেছে, সাম্প্রতিক অস্থিরতায় ৩,১১৭ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২,৪২৭ জন বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।
তেহরানের দাবি, এই সহিংসতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের মদদ রয়েছে—যা ওয়াশিংটন প্রত্যাখ্যান করেছে।
সূত্র- আলজাজিরা।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর