শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড ভণ্ডুল করতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট (টিএইচএম) বিভাগের সভাপতি মো. শরিফুল ইসলামকে অপহরণের অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদের বিরুদ্ধে।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) সকাল আটটায় ঝিনাইদহে তাঁর নিজ বাসা থেকে শিক্ষক শরিফুল ইসলামকে অপহরণ করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে শিক্ষক অপহরণের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও প্রশাসন ভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে দীর্ঘ চার ঘণ্টা পর শিক্ষক শরিফুল ইসলামকে তাঁর নিজ বাসায় পৌঁছে দেন আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদ।
সূত্র জানায়, বুধবার সকাল ১০টায় ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট (টিএইচএম) বিভাগের নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ উদ্দেশ্যে শিক্ষক শরিফুল ইসলাম সকাল ৮টার দিকে ঝিনাইদহে তাঁর নিজ বাসা থেকে ক্যাম্পাসের উদ্দেশে রওয়ানা হন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদ তাকে একটি মোটরসাইকেলে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যান বলে অভিযোগ উঠে।
এ-সংক্রান্ত শিক্ষক শরিফুলের বাসার একটি সিসিটিভি ফুটেজ সাংবাদিকের কাছে আসে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একটি মোটরসাইকেলে করে আহ্বায়ক সাহেদ শিক্ষক শরিফুলকে নিয়ে যাচ্ছেন। এসময় আহ্বায়ক সাহেদ হেলমেট এবং শিক্ষক শরিফুল মাস্ক পরিহিত ছিলেন। এরপর টানা চার ঘণ্টা শিক্ষক শরিফুল ইসলাম অপহৃত অবস্থায় ছিলেন এবং তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে শিক্ষক শরিফুল ইসলামের ছোট ভাই জাহিদ বলেন, “সকালে নিয়োগ বোর্ডে উপস্থিত থাকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থেকে বারবার আমার ভাইকে ফোন করা হচ্ছিল। অসুস্থতার কারণে তিনি প্রথমে যেতে পারবেন না বলে জানান। তবে বারবার ফোন আসায় শেষ পর্যন্ত তিনি ক্যাম্পাসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন।
তিনি বাসার নিচে নামার পর একটি মোটরসাইকেলের শব্দ শোনা যায়। তখন আমাদের ধারণা হয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভাইয়াকে নিতে কোনো গাড়ি পাঠিয়েছে। কিন্তু প্রায় আধা ঘণ্টা পর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গাড়ি আসে। গাড়ির চালক হাসমত ভাইয়াকে নিতে এসেছিলেন।”
জাহিদ আরও বলেন, “এ সময় আমি তাঁকে জানাই যে, ভাইয়া ইতোমধ্যে বাসা থেকে বের হয়ে গেছেন। এরপর থেকে আর ভাইয়ার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনার পর থেকে ভাইয়ার ব্যক্তিগত ও অফিসিয়াল উভয় মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।”
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের সভাপতি অনুপস্থিত থাকায় বুধবার সকাল ১০টায় ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের নিয়োগ বোর্ড শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা এক ঘণ্টা বিলম্বে সকাল ১১টায় শুরু হয়। ইতোমধ্যে বোর্ডের লিখিত পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অপহরণকৃত বলে অভিযোগ থাকা ওই শিক্ষক বোর্ডে উপস্থিত হননি।
বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘‘সাহেদ আদু ভাই বলেছে, নিরাপত্তার খাতিরে স্যার নিয়েছে। আদু ভাই নিরাপত্তা দেওয়ার কে? ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য প্রশাসন আছে। আমরা বুঝতে ভুল করিনা যে সরষের মধ্যে ভূত লুকিয়ে আছে। নিয়োগ বাণিজ্য হচ্ছে না, তাই তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যদি সত্য হয়ে থাকে আদু ভাইকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত করতে হবে। নিয়মিত শিক্ষার্থীর বাইরে ক্যাম্পাসে কেউ রাজনীতি করতে পারবে না। যতক্ষণ না স্যারকে নিরাপদে আমাদের মাঝে ফেরত দেয়া না হবে আমরা রাজপথ ছাড়বো না।”
এদিকে দুপুর ১২টার দিকে সাংবাদিকরা অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমি তাঁকে অপহরণ করব কেন? তিনি কোথায় আছেন, তা আমি জানি না। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।” এ সময় তিনি ক্যাম্পাসে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানিয়ে ফোন কেটে দেন।
পরে দুপুর পৌনে একটায় তিনি এক পোস্টে শিক্ষক শরিফুল তার সঙ্গে ছিলেন বলে স্বীকার করে বলেন, “প্রিয় শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক ভাইয়েরা, আমার অবস্থান সুস্পষ্ট। আজ সকালে টিএইচএম বিভাগের সম্মানিত চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম জুয়েল নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। সে কারণে তিনি আমাকে সকালে ফোন দেন এবং আমি নিজে সশরীরে গিয়ে তাঁকে নিয়ে আসি। সহকারী অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম জুয়েল আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত ছোটভাই।”
তিনি আরো বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এবং রেজিস্টার ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে হুমকি ধামকি দিয়েছে এবং গতপরশু সোমবার প্রক্টরের নির্দেশে টিএইচএম বিভাগে গুটিকয়েক লোক পাঠিয়ে দরজা বন্ধ করে ৪ জন শিক্ষককে জোরপূর্বক মারধরের হুমকি দিয়ে শিক্ষক নিয়োগের প্ল্যানিং করেছে। ৪ জন শিক্ষককে প্রাননাশের হুমকি এবং সিসি ক্যামেরা ফুটেজ জোরপূর্বক ডিলিট করা হয়েছে।
পোস্টে তিনি আরও দাবি করেন, “গতকাল ও আজও প্রক্টর তাঁকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। এসব কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে জুয়েল আমার কাছেই ছিলেন। বর্তমানে জুয়েল তাঁর নিজ বাসা ঝিনাইদহে অবস্থান করছেন।”
পরে দুপুর ১টা ১৯ মিনিটের দিকে ওই শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে ফেসবুক লাইভে আসেন শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ। লাইভে সাহেদ আহম্মেদ শরিফুলকে কথা বলতে আহ্বান জানালে শিক্ষক শরিফুল বলেন, “আমি বাসায় আছি, নিরাপদে আছি। আমাকে কেউ অপহরণ করেনি। সকাল ৯টার দিকে সাহেদ ভাইয়ের সঙ্গে বাইরে গিয়েছিলাম এবং দুপুর ১২টার দিকে তিনি নিজেই আমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়েছেন।”
নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে ওই শিক্ষক আরও বলেন, “নিরাপত্তাহীনতার বিষয় ছিল, তবে এখন আর কোনো সমস্যা নেই। সবাই বাসায় আছেন। গত পরশু বিভাগে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। আজ সকালে একটি নিয়োগ বোর্ড ছিল। বর্তমানে আমি নিরাপদে আছি, কোনো সমস্যা নেই।” ওই লাইভে সাহেদ আহম্মেদ বলেন, “আপনারা অনর্থক কোনো ব্লেম গেম খেলবেন না।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর
ক্যাম্পাস এর সর্বশেষ খবর