আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে খাগড়াছড়ি জেলার রাজনীতিতে যে পরিবর্তনের আভাস মিলছে, তা কেবল প্রচার-প্রচারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দলবদল ও ভোটব্যাংকের পুনর্বিন্যাসে নির্বাচনী সমীকরণ নতুনভাবে গঠিত হচ্ছে।
গত দেড় মাসে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে প্রায় দুই সহস্রাধিক মানুষের বিএনপিতে যোগদানকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা একটি তাৎপর্যপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন।
খাগড়াছড়ির রাজনীতির বিশেষত্ব হলো- এখানে সংখ্যার রাজনীতির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সামাজিক প্রভাব ও কমিউনিটি নেতৃত্ব। পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভোট প্রায় সমান গুরুত্ব বহন করায় যেকোনো নির্বাচনে পাহাড়ি ভোটব্যাংকের অবস্থান নির্ধারণী ভূমিকা পালন করে। অতীত নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বড় অংশ যেদিকে ঝুঁকেছে, শেষ পর্যন্ত সেই প্রার্থীই বিজয়ের দিকে এগিয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় চাকমা সম্প্রদায়ের প্রায় এক হাজার বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষের প্রকাশ্যভাবে বিএনপিতে যোগদান নির্বাচনী অঙ্কে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। খাগড়াছড়ি টাউন হলে অনুষ্ঠিত এই যোগদানে হেডম্যান, কার্বারী, ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি ও সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উপস্থিতি বিষয়টিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
পাহাড়ি সমাজে ভোটের সিদ্ধান্ত ব্যক্তি নয়, বরং নেতৃত্বনির্ভর হওয়ায় এই যোগদান কেবল এক হাজার ভোটে সীমাবদ্ধ থাকবে না- বরং পরিবার ও কমিউনিটির মাধ্যমে তা কয়েক হাজার ভোটে রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এর আগে মারমা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের বিএনপির পক্ষে প্রকাশ্য সমর্থনও একই রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। ফলে পাহাড়ি ভোটব্যাংকের একটি বড় অংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকছে- এমন ধারণা এখন আর অনুমানের পর্যায়ে নেই, বরং দৃশ্যমান বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে।
একই সঙ্গে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিভিন্ন দল থেকে বিএনপিতে যোগদান দলটির সাংগঠনিক শক্তি বাড়িয়েছে। এনসিপি, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ থেকে আসা নেতাকর্মীরা সংখ্যায় সীমিত হলেও তারা স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী ও মাঠপর্যায়ে সক্রিয়। ফলে বিএনপি শুধু ভোটার বাড়াচ্ছে না, বরং নির্বাচনী মাঠ পরিচালনার সক্ষমতাও জোরদার করছে- যা যেকোনো নির্বাচনে একটি বড় সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয়।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও মাঠে সক্রিয় রয়েছে। তাদের মূল শক্তি সংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ভোটব্যাংক। ভোট বিভক্ত হলে এই সংগঠিত শক্তি বড় প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পাহাড়ি ও বাঙালি ভোট যদি একাধিক প্রার্থীর মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, তাহলে জামায়াত বা ইসলামী আন্দোলন অপ্রত্যাশিত সুবিধা পেতে পারে।
স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। তারা নির্দিষ্ট এলাকায় ব্যক্তিগত প্রভাব ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও আঞ্চলিক সংগঠনের প্রভাবের কারণে উল্লেখযোগ্য ভোট কাটতে সক্ষম। ফলে তাদের অবস্থান নির্বাচনী ফল নির্ধারণে পরোক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে।
জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১১৪ জন। নারী ও পুরুষ ভোটারের প্রায় সমান উপস্থিতি নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। উন্নয়ন, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সেবা- এই বিষয়গুলো ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে খাগড়াছড়িতে চলমান দলবদল কেবল রাজনৈতিক সংখ্যা বাড়া-কমার ঘটনা নয়; এটি পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাহাড়ি ভোটব্যাংকের গতিপথ, ভোট বিভক্তির মাত্রা এবং শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক কৌশলই নির্ধারণ করবে কে পাচ্ছেন শেষ হাসি। তবে এটুকু স্পষ্ট, খাগড়াছড়ির রাজনীতি আর আগের জায়গায় নেই; নির্বাচনের মাঠে হিসাব নতুন করে কষতে হচ্ছে সব পক্ষকেই।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর