হবিগঞ্জ-১ আসনে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সিমি কিবরিয়া। দিনরাত প্রচারণায় ব্যস্ত থেকে তিনি সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানেই পাচ্ছেন ব্যাপক সাড়া, যা প্রতিপক্ষের প্রার্থীদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও নির্বাচনী প্রচারণায় সিমি কিবরিয়া প্রধান আলোচ্য বিষয়। প্রতিপক্ষের প্রার্থী ও সমর্থকরা তাঁকে আক্রমণ করে ফেসবুক পোস্ট ও উঠান বৈঠকে বক্তব্য দিচ্ছেন। ফলস্বরূপ, রেজা কিবরিয়ার স্ত্রী সিমি কিবরিয়া এখন নবীগঞ্জ ও বাহুবলের ‘টক অব দ্য টাউন’।
সিমি কিবরিয়া প্রতিদিন ভোটের প্রচারণায় চমকপ্রদ বক্তব্য দিয়ে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। তাঁর প্রতিটি জনসমাবেশে জনসমাগম বাড়ছে এবং মানুষ মুগ্ধ হয়ে তাঁর বক্তব্য শুনছে। তাঁর কয়েকটি খণ্ডিত বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। সমালোচনার চেয়ে আলোচনা বেশি হচ্ছে তরুণ নারী নেত্রী হিসেবে সিমি কিবরিয়ার আলোড়ন সৃষ্টি নিয়ে।
ধানের শীষের প্রার্থী ড. রেজা কিবরিয়াকে ঘিরে বিএনপি এককাট্টা। এর মধ্যে তৃণমূলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়ার সহধর্মিণী সিমি কিবরিয়া। নির্বাচনী জনপদ চষে বেড়াচ্ছেন তিনি, চালাচ্ছেন নির্ঘুম গণসংযোগ। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে ব্যাপক প্রচারণা চলছে, যা এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রচারণার ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
ইতিপূর্বে হবিগঞ্জ-১ আসনে কোনো প্রার্থীর সহধর্মিণীকে এভাবে কখনও সরব দেখা যায়নি। রেজা কিবরিয়ার স্ত্রী সিমি কিবরিয়া একাই যেন একশ। তিনি প্রতিদিন ১০-১৫টি উঠান বৈঠক করছেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর ফেসবুকে প্রতিদিন ১০-১৫টি ভিডিও আপলোড করছেন। এসব ভিডিও বার্তা ভোটের মাঠে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। সিমি কিবরিয়া প্রয়াত শ্বশুর শাহ এএমএস কিবরিয়া এবং স্বামী ড. রেজার উন্নয়নের রোড ম্যাপ নিয়ে প্রতিটি মুহূর্তে সরব। প্রতিপক্ষের সমর্থকদের সাইবার বুলিং, সমালোচনা ও নারীর প্রতিকূলতা কোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি। যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানেই গণজোয়ার তৈরি হচ্ছে। তাঁর পেছনেই ছুটে চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাল্টিমিডিয়াগুলো। তিনি অবলীলায় সবকিছু সামলাচ্ছেন। নবীগঞ্জ ও বাহুবল প্রেসক্লাবে মতবিনিময় করেছেন। হাসি মুখে প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন এবং কৌশলী বক্তব্য দিয়ে সবাইকে হতবাক করেছেন।
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শেখ সুজাত মিয়ার (ঘোড়া প্রতীক) এবং ১০ দলীয় জোটের (রিকশা প্রতীক) বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা সিরাজুল ইসলাম সিমি ম্যাজিকে হতভম্ব হয়ে পড়েছেন। হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে ড. রেজা কিবরিয়া মনোনয়ন পাওয়ার পরপরই মাঠে নামেন তাঁর স্ত্রী সিমি কিবরিয়া। গৃহবধূ থেকে মাত্র কয়েক দিনেই রাজনীতির মাঠে আলোচনায় এসে তিনি চমক দেখান। তিনি গ্রাম থেকে গ্রামান্তর, চা বাগান সবখানেই ছুটে চলছেন এবং সবখানেই আলোচনায় সিমি কিবরিয়া।
বিএনপি ও স্থানীয় সূত্র জানায়, হবিগঞ্জ জেলার অন্যতম বিদ্যুৎ, গ্যাস ও খনিজ সমৃদ্ধ নির্বাচনী এলাকা থেকেই ভোটের উৎসব শুরু হয়। ওই আসন থেকে জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট শাহজাহান আলী মনোনয়ন প্রত্যাহারের পর ড. রেজার বিজয় নিশ্চিত ছিল। এরই মধ্যে উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য ও সাবেক এমপি আলহাজ্ব শেখ সুজাত মিয়া। শেষ মুহূর্তে এসে নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে লড়ে যাচ্ছেন শেখ সুজাত মিয়া। ফলশ্রুতিতে তাঁকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এ নিয়ে শেখ সুজাত মিয়া বলেন, “যথাসময়ে ড. রেজা আমার সঙ্গে দেখা না করায় নির্বাচন করতে হয়েছে। বিজয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী।”
সিমি কিবরিয়ার তৎপরতা নিয়ে লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক ও এনটিভির ব্যুরো প্রধান ফারছু চৌধুরী বলেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি, এই নির্বাচনী প্রচারণায় সিমি কিবরিয়া অত্যন্ত পরিশ্রমী একজন নারী। আমি বাংলাদেশে তাঁর মতো কাউকে শুনিনি বা দেখিনি।” তিনি আরও বলেন, “গত মঙ্গলবার রাতে যখন তিনি আমাকে ফোন করেছিলেন, তখন বাংলাদেশের স্থানীয় সময় ভোর ৩:৩০ মিনিট ছিল। আমি অবাক হয়েছিলাম যে গভীর রাত পর্যন্ত তিনি জেগে আছেন, সারাদিন প্রচারণার পরেও তিনি রাতে না ঘুমিয়ে একজনের সঙ্গে কথা বলতেছেন, যিনি আপনার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত—তবুও তিনি সময় দিয়েছেন এবং ধৈর্য ধরে শুনেছেন। এরকম একজন পরিশ্রমী নারী তাঁর স্বামীকে বিজয়ী করতে পারেন।” ফারছু চৌধুরীর মতে, “আমার মনে হয়েছে যে নবীগঞ্জ-বাহুবল আসন (হবিগঞ্জ-১) বাংলাদেশে ইতিহাস তৈরি করবে সিমি কিবরিয়ার পরিশ্রমে। কীভাবে দিনরাত প্রচারণার জন্য সময় পরিচালনা করেন তা দেখে আমি সত্যিই অবাক। আমার কাছে মনে হয়েছে খুব উদ্যমী নারী বাংলাদেশে তাঁর মতো আর কেউ নেই।”
রেজা কিবরিয়ার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান চৌধুরী শেফু বলেন, “এএসএম কিবরিয়া সফল অর্থমন্ত্রীও ছিলেন। এটি একটি রাজনৈতিক পরিবার। এ পরিবারেরই বধূ সিমি কিবরিয়া। সুতরাং রাজনীতি তিনি দেখছেন। নিজেও শিক্ষিত নারী। সে জন্য রাজনীতি শিখতে তাঁর কোনো বেগ পেতে হয়নি।”
এ ব্যাপারে সিমি কিবরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি নবীগঞ্জ ও বাহুবল মানুষের যে রকম সাড়া ও ভালোবাসা পেয়েছি তাতে অভিভূত। যারা আমাকে নিয়ে সমালোচনা করছেন তারা আমার জন্য শিক্ষণীয় বিষয়। তাদের সমালোচনা আমাকে নতুন পথ ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছে। আমি সমালোচনাকে মনে করি পথচলায় অনেক সংশোধন হওয়া যায়, তাদের সমালোচনা আমাকে কাজের প্রতি গতি ও দায়িত্ব বাড়াচ্ছে। আমি একটি রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য, নতুন পথচলা এখন শিক্ষা গ্রহণ করছি। আমি জনগণের কাছে শিক্ষা নিতে চাই ও এলাকার মানুষের মধ্যে উন্নয়নের মাধ্যমে সেবা দিতে এসেছি। আমি ও আমার পরিবার সব সময় চিন্তা করছি কিভাবে এলাকার উন্নয়নে কি কি করতে হবে ও দেশের সেবা করা যায় সেটাই আমাদের চিন্তা ও ধারণা।”
উল্লেখ্য, হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসন থেকে লড়ছেন ড. রেজা কিবরিয়া (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ সুজাত মিয়া (ঘোড়া), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা সিরাজুল ইসলাম মীরপুরী (রিক্সা), বৃহত্তর সুন্নী জোট ইসলামী ফ্রন্টের মুফতি বদরুর রেজা সেলিম (চেয়ার), গণফ্রন্ট (জাসদ) প্রার্থী কাজী তোফায়েল আহমদ (মোটর গাড়ি)। মোট ভোটার ৪ লাখ ৬১ হাজার ২৮৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩৩ হাজার ১৬ জন এবং নারী ২ লাখ ২৮ হাজার ২৬৮ জন। নির্বাচনী এলাকায় ১৭৭টি কেন্দ্র ও ৯০৫টি ভোটকক্ষ চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর