আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ উপলক্ষে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি, প্রজেকশন বিডি ও জাগরণের সহযোগিতায় একটি প্রাক-নির্বাচনী জনমত জরিপ পরিচালনা করেছে। এই জরিপের মূল লক্ষ্য ছিল জনসাধারণের মনোভাব, রাজনৈতিক পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র, ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী প্রধান বিষয়গুলো চিহ্নিত করা, সম্ভাব্য ভোটের ধরনের পূর্বাভাস প্রদান এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনসমর্থন পরিমাপ করা।
জরিপ পরিচালনার জন্য ৩০০টি সংসদীয় আসনের প্রত্যেকটিকে একটি স্বতন্ত্র ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম ধাপে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ডগুলোকে ‘প্রাইমারি স্যাম্পলিং ইউনিট’ (PSU) হিসেবে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে নির্বাচন করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচিত স্থানগুলো থেকে প্রতিটি ক্ষেত্রে ২০-৩০ জন ভোটারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এভাবে প্রতি নির্বাচনী এলাকায় মোট ১০০-৩০০ জন উত্তরদাতার নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
জরিপে মোট ৬৩ হাজার ১১৫ জনের মতামত নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৩৬ হাজার ৬৩৪ জন পুরুষ (৫৭.৫৯%) এবং ২৬ হাজার ৯৮১ জন নারী (৪২.৪১%) অংশ নেন। বয়সভিত্তিক হিসাবে ১৮-২৯ বছরের মধ্যে ছিলেন ২৭.৪৮%, ৩০-৪৪ বছর বয়সী ৪১.২৫%, ৪৫-৫৯ বছর বয়সী ২৩.৭৭% এবং ষাটোর্ধ্ব ছিলেন ৭.৫০%।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৯২% ভোট দেবেন বলে জানিয়েছেন, ৪% ভোট দেবেন না এবং ২.৫% সিদ্ধান্ত নেননি। নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের প্রধান প্রত্যাশা হলো দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ (৬৭%), আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি (৫৩%), দুর্নীতি বন্ধ (৫২%) এবং চাকরির সুযোগ সৃষ্টি (৪৮%)। ৩৭% মানুষ চাঁদাবাজি থেকে মুক্তি চান। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ৭১% মানুষ প্রার্থীর যোগ্যতা এবং ৪৭% মানুষ দলীয় আদর্শকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেছেন। এছাড়াও দলীয় ভূমিকা (২৩%), দলীয় অভিজ্ঞতা (৩৬%), উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি (৩১%) এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান (১৮%) বিবেচনার কথা উঠে এসেছে।
জরিপের ফলাফলে জোট ভিত্তিক সমর্থনে বিএনপি জোট ৪৪.১% এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ৪৩.৯% সমর্থন পেয়েছে। জাতীয় পার্টির জোটের প্রতি সমর্থন মাত্র ১.৭% এবং ৬.৫% মানুষ সিদ্ধান্ত নেননি।
লিঙ্গভিত্তিক সমর্থনে ৪৭% পুরুষ বিএনপি জোটকে এবং ৪২% পুরুষ জামায়াত জোটকে সমর্থন দিয়েছেন। নারীদের মধ্যে ৪৬% জামায়াত জোটকে এবং ৪২% বিএনপি জোটকে সমর্থন দিয়েছেন।
নগরের ৪৬% এবং গ্রামের ৪২% ভোটার বিএনপি জোটকে সমর্থন করেছেন। অন্যদিকে নগরের ৪৩% এবং গ্রামের ৪৫% ভোটার জামায়াত জোটকে সমর্থন করেছেন। অর্থাৎ পুরুষ ও নগরের ভোটারদের মধ্যে বিএনপি জোট এবং নারী ভোটার ও গ্রাম পর্যায়ে জামায়াত জোট এগিয়ে আছে।
ধর্মভিত্তিক হিসাবে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ৪৩% বিএনপি জোটকে এবং ৪৬% জামায়াত জোটকে সমর্থন দিয়েছেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ৫৫% বিএনপি জোটকে এবং ২৮% জামায়াত জোটকে সমর্থন দিয়েছেন। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ৩২% বিএনপি জোটকে এবং ৪৩% জামায়াত জোটকে সমর্থন দিয়েছেন। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ৩৪% বিএনপি জোটকে এবং ১০% জামায়াত জোটের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইসলাম ধর্ম ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ভোটারদের মধ্যে জামায়াত জোটের সমর্থন বেশি, আর হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ভোটারদের মধ্যে বিএনপি জোটের সমর্থন বেশি।
বয়সভিত্তিক হিসাবে ১৮-২৯ বছর বয়সীদের ৫১% জামায়াত জোটকে, ৩৮% বিএনপি জোটকে সমর্থন দিয়েছেন। ৩০-৪৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ৪৭% বিএনপি জোটকে এবং ৪২% জামায়াত জোটকে সমর্থন দিয়েছেন। ৪৫-৫৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ৪৮% বিএনপিকে, ৪০% জামায়াত জোটকে এবং ৬০ বছরের উপরে ৪৪% বিএনপি ও ৪২% জামায়াত জোটকে সমর্থন দেন।
শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন ৪৯% বিএনপিকে, ৩৯% জামায়াত জোটকে সমর্থন করেছেন। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্নকারীদের মধ্যে বিএনপি জোটের প্রতি সমর্থন ৪৯% এবং জামায়াত জোটের প্রতি সমর্থন ৩৮%। মাধ্যমিক শিক্ষাগত যোগ্যতাধারীদের মধ্যে ৪৪% বিএনপি জোট ও ৪৩% জামায়াত জোট এবং উচ্চ মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে ৪২% বিএনপি জোট ও ৪৮% জামায়াত জোটের প্রতি সমর্থন দেন। গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে ৫১% জামায়াত জোটকে এবং ৩৭% বিএনপি জোটকে সমর্থন করেন। পোস্ট গ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রে ৫১% জামায়াত জোটকে এবং ৩৮% বিএনপি জোটকে সমর্থন দেন।
বিএনপি জোটের প্রতি সমর্থনের পেছনে ৮৪% মানুষ দেশ পরিচালনার অতীত অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। জামায়াত জোটের প্রতি সমর্থনের কারণ হিসেবে সততা ও দুর্নীতির প্রতি কম মনোভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আসনভিত্তিক ফলাফলে জামায়াত জোট ১০৫টি এবং বিএনপি জোট ১০১টি আসনে জয়লাভ করতে পারে। এছাড়াও ৭৫টি আসনে দুই জোটের প্রার্থীদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে এবং ১৯টি আসনে অন্যরা জয়লাভ করতে পারে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৭৪.৯% মানুষ গণভোট সম্পর্কে সচেতন এবং ২৫.২% মানুষ সচেতন নন। গণভোটে 'হ্যাঁ' দেওয়ার কথা বলেছেন ৮৯.৬% এবং 'না' এর কথা বলেছেন ৯.১% মানুষ।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর