ইউরোপীয় ইউনিয়নের বন্দর ব্যবহার করে অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে নিয়মিত পণ্য পরিবহন করছে বিশ্বের বৃহত্তম শিপিং কোম্পানি মেডিটেরেনিয়ান শিপিং কোম্পানি (এমএসসি)। আল জাজিরা ও ফিলিস্তিনি যুব আন্দোলন (পিওয়াইএম)-এর যৌথ অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক এই শিপিং জায়ান্ট যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি ডাটাবেস থেকে পাওয়া বাণিজ্যিক নথির ভিত্তিতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত এমএসসি অন্তত ৯৫৭টি চালান অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে সহায়তা করেছে। এর মধ্যে ৫২৯টি চালান ইউরোপীয় বন্দর হয়ে গেছে- এর মধ্যে স্পেন দিয়ে ৩৯০টি, পর্তুগাল দিয়ে ১১৫টি, নেদারল্যান্ডস দিয়ে ২২টি এবং বেলজিয়াম দিয়ে দুটি।
এমএসসির মালিক ইতালীয় ধনকুবের জিয়ানলুইজি আপোন্তে এবং তাঁর স্ত্রী রাফায়েলা আপোন্তে-ডায়ামান্ত। রাফায়েলা ১৯৪৫ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত হাইফা শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও এডিনবরো বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক নিকোলা পেরুজিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক আইনে ইসরায়েলি বসতিগুলো অবৈধ হিসেবে বিবেচিত। এসব বসতি থেকে পণ্য বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা কার্যত অবৈধ দখলকে সমর্থন করার শামিল।”
তদন্তে দেখা গেছে, খাদ্যপণ্য, বস্ত্র, ত্বক পরিচর্যা সামগ্রী থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক পাথর—বিভিন্ন ধরনের পণ্য পরিবহনে ইউরোপীয় বন্দর ও শিপিং কোম্পানির ওপর নির্ভর করছে এসব বসতি।
ইইউর অবস্থান ও আইনি বাধ্যবাধকতা
ইউরোপীয় ইউনিয়ন পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব স্বীকার না করলেও তদন্তে দেখা গেছে, ইউরোপীয় বন্দর থেকে সরাসরি অবৈধ বসতিতে পণ্য পাঠানো হয়েছে। ২০২৫ সালে ইতালির রাভেন্না বন্দর থেকে অন্তত ১৪টি চালান এমএসসি পরিবহন করে, যেখানে গন্তব্য হিসেবে বসতির নাম ও পোস্টাল কোড স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।
এটি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) ২০২৪ সালের এক মতামতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেখানে বলা হয়েছে—তৃতীয় রাষ্ট্রগুলো এমন কোনো বাণিজ্য বা বিনিয়োগে জড়াতে পারবে না, যা অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ পরিস্থিতি বজায় রাখতে সহায়তা করে।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন অবৈধ ইসরায়েলি বসতির উন্নয়ন বা রক্ষণাবেক্ষণে অবদান রাখা বন্ধ করে।
বসতি অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার অভিযোগ
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, পশ্চিম তীরের ‘এরিয়া সি’ ও অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের বসতিগুলো প্রতিবছর প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার ইসরায়েলি অর্থনীতিতে যোগ করে। বিপরীতে, ফিলিস্তিনি অর্থনীতি ২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৭০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
তদন্তে আরও দেখা যায়, এমএসসি অন্তত দুটি কোম্পানির পণ্য পরিবহন করেছে, যাদের ঠিকানা ছিল অবৈধ বসতি মালেহ আদুমিম ও মিশোর আদুমিম শিল্পাঞ্চল। এর মধ্যে একাধিক প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) অবৈধ বসতিতে কার্যরত কোম্পানির তালিকাভুক্ত।
এমএসসির বক্তব্য
এমএসসি আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, তারা যেখানে কাজ করে সেখানকার “সব বৈশ্বিক আইন ও বিধিবিধান মেনে চলে” এবং ইসরায়েল-সংক্রান্ত সব চালানেও একই নীতি প্রযোজ্য।
তবে পিওয়াইএম বলেছে, “এমএসসি অবৈধ বসতিগুলোকে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার অবকাঠামো সরবরাহ করছে, যা ফিলিস্তিনি ও সিরীয় ভূমির অব্যাহত দখলকে উৎসাহিত করছে।”
সূত্র-আলজাজিরা।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর