পহেলা ফাল্গুন আর বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এলে কক্সবাজারের চকরিয়ার বরইতলি যেন রঙে ভরে ওঠে। গোলাপের লাল, গ্লাডিওলাসের সাদা-গোলাপি, জারবেরার উজ্জ্বল আভা মিলিয়ে পুরো এলাকা তখন এক টুকরো ফুলের রাজ্য। এবার সেই রঙের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন। প্রার্থীদের বরণ, পথসভা আর বিজয় মিছিলে ফুলের বাড়তি চাহিদা যোগ হওয়ায় তিন দিনজুড়ে বাজার ছিল সরগরম।
চাষিরা বলছেন, চাহিদার পারদ তুঙ্গে থাকায় এবার দামও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ফলে মৌসুম শেষে অনেকের মুখে ফিরেছে হাসি।
উপজেলার বরইতলিতে চলতি মৌসুমে প্রায় ৫০ একর জমিতে গোলাপ ও গ্লাডিওলাস চাষ হয়েছে।
স্থানীয় ফুলচাষী মোহাম্মদ আজিজ এক একর জমিতে গোলাপ চাষ করেছেন। তার মতে, চাষে খরচ হয়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকা। গত তিন মাসে এবং ভালোবাসা দিবস ঘিরে প্রায় সমপরিমাণ টাকার ফুল বিক্রি করেছেন তিনি। বাগান থেকে প্রতিটি গোলাপ ১০ থেকে ১২ টাকায় এবং গ্লাডিওলাস ২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
ভালোবাসা দিবসের আগের দুই দিন অনেকেই সরাসরি বাগানে গিয়ে ফুল কিনে নিয়ে গেছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর ঝামেলা কমেছে, চাষিরাও নগদ দাম পেয়েছেন দ্রুত।
চকরিয়া-বরইতলি সড়কের আলভি ফুলের আড়তের স্বত্বাধিকারী মোজাম্মেল হক জানান, ভালোবাসা দিবস ঘিরে দুই দিনে প্রায় ৪ লাখ টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে। তবে নির্বাচনের সময় যানবাহন চলাচল সীমিত থাকায় কিছুটা ক্ষতির মুখেও পড়তে হয়েছে। দূরবর্তী চালান সময়মতো পৌঁছায়নি, ফলে চাহিদা থাকলেও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবস মিলিয়ে বরইতলি থেকে প্রায় কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে। এখানকার ফুল দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানোর পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হয়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, নির্বাচনী পরিস্থিতির কারণে পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় পাইকারি বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক চালান সময়মতো পৌঁছায়নি। মাঠপর্যায়ে দাম তুলনামূলক কম থাকলেও পরিবহন ব্যয়, নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি এবং পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় খুচরা বাজারে দাম বেড়ে যায়। দেশের বড় উৎপাদন কেন্দ্র যশোর থেকে গোলাপ, জারবেরা, গ্লাডিওলাস ও রজনীগন্ধাসহ নানা ফুল চট্টগ্রামে আসে।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, সংরক্ষণ সুবিধা সীমিত হওয়ায় দীর্ঘ সময় ফুল সতেজ রাখা কঠিন। ফলে দ্রুত বিক্রির চাপ থাকে।
এবার বাজারে কলি অবস্থার গোলাপ, যা ‘ক্যাপ গোলাপ’ নামে পরিচিত, তার চাহিদা ছিল বেশি। বিশেষ ফোম নেট দিয়ে ঢেকে রাখায় এগুলো তুলনামূলক কম নষ্ট হয়। খুচরা বাজারে প্রতিটি ফুল ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তরুণ ক্রেতাদের আগ্রহ থাকলেও অনেকেই উচ্চ দামের কারণে সীমিত পরিমাণে কিনেছেন।
বর্তমানে খুচরা বাজারে দেশি গোলাপ ৩০ থেকে ৪০ টাকা, আমদানি করা বা চায়না গোলাপ ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা, রজনীগন্ধা ১৫ থেকে ২০ টাকা, জারবেরা ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং চন্দ্রমল্লিকা ১০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চট্টগ্রাম শহরের পার্শ্ববর্তী উপজেলাগুলোতে ফুলচাষ কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আবহাওয়া পরিবর্তন, আগাম ফুল ফোটা এবং বাজারে অনিশ্চয়তা অনেককে ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহিত করছে। দক্ষিণাঞ্চলের উৎপাদন কেন্দ্র চকরিয়া থেকেও আগের তুলনায় কম ফুল এসেছে। অনেক জমিতে বিকল্প ফসলের চাষ বেড়েছে।
চট্টগ্রাম ফুল ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মো. জসিম জানান, শনিবার ভোরে যশোর, চকরিয়া ও হাটহাজারী থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকার ফুল নগরে এসেছে। তবে নির্বাচনের আগের দিন বিক্রি কম ছিল। নতুন জনপ্রতিনিধিদের বরণে ফুলের ব্যবহার বাড়লে বাজার আবার চাঙা হতে পারে। ফুলের বাজারে বাহারি রঙ যতটা চোখে পড়ে, ভেতরের হিসাবের খাতা ততটাই সংবেদনশীল। কয়েক দিনের উৎসবেই বছরের বড় অংশের আয় নির্ভর করে। তাই পহেলা ফাল্গুন, ভালোবাসা দিবস কিংবা নির্বাচন, প্রতিটি আয়োজনই চাষি থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের মৌসুমে দাম ভালো থাকায় বরইতলির অনেক চাষির মুখে স্বস্তির হাসি। তবে পরিবহন ও সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নত না হলে ভবিষ্যতে এই সম্ভাবনাময় খাত টেকসই হবে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর