• ঢাকা
  • ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ২১ মিনিট পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ০৫ মার্চ, ২০২৬, ০১:২৩ দুপুর

ষড়যন্ত্রে নিভে গেছে শ্রেণিকক্ষের আলো, সৈকতে চলছে বেঁচে থাকার লড়াই

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট। বুধবার (৪ মার্চ) সন্ধ্যার নরম আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে ঢেউয়ের গর্জনের ভেতর। পর্যটকদের ভিড়ের মাঝেই একটি ভ্রাম্যমাণ ভ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে খাবার বিক্রি করছেন এক নারী। মুখে ক্লান্তি, চোখে চাপা আতঙ্ক আর দীর্ঘদিনের না বলা কষ্টের ছাপ। পরিচয় জানতে চাইতেই হঠাৎ ভেঙে পড়লেন তিনি। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমি একজন স্কুলের শিক্ষিকা… এখন ভ্যান ঠেলে খাবার বিক্রি করি।’

এই নারী ছেননুয়াইং রাখাইন (৪৭)। কক্সবাজার সদরের চৌফলদন্ডীর উত্তর রাখাইনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন তিনি। এক বছর আগেও প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিশুদের পাঠদান করতেন। ব্ল্যাকবোর্ডে চক হাতে লিখতেন অক্ষর, শেখাতেন স্বপ্ন দেখতে। সেই শ্রেণিকক্ষ এখন তার কাছে শুধু স্মৃতি।

একটি মামলার জটিলতা আর পারিবারিক ষড়যন্ত্র তার জীবনকে উল্টে দিয়েছে। হারিয়েছেন চাকরি, হারিয়েছেন বসতভিটা। সব হারিয়ে এখন কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ভ্যানে করে খাবার বিক্রি করে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এই শিক্ষিকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশায় ছিলেন ছেননুয়াইং রাখাইন। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন প্রিয় শিক্ষক। স্বামী মংছিথেইং ব্যবসা করতেন। দুজনের আয়েই চলছিল সংসার। কিন্তু সেই সংসারে অশান্তির সূচনা হয় পারিবারিক বিরোধ থেকে।

অভিযোগ উঠেছে, তার আপন ভগ্নিপতি মেথোইন রাখাইনের সঙ্গে বিরোধ থেকেই শুরু হয় সব বিপর্যয়। শিক্ষিকার ভাষ্য, স্বামীর ব্যবসায় লোকসান হলে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বাধ্য হয়ে ভগ্নিপতির কাছে ১০ শতক বসতভিটা বন্ধক দিতে হয়। শর্ত ছিল, পাঁচ বছরের মধ্যে টাকা ফেরত দিতে না পারলে জমিটি বিক্রি করা যাবে। কিন্তু সেই সুযোগকে ব্যবহার করে ভগ্নিপতি তাকে বারবার অনৈতিক প্রস্তাব দিতে শুরু করেন বলে অভিযোগ করেন ছেননুয়াইং রাখাইন।

তিনি বলেন, ‘একদিন ঘরে একা পেয়ে আমাকে জোর করার চেষ্টা করেন। আমি চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন চলে আসে। এরপর থেকেই আমার ওপর চাপ বাড়তে থাকে।’

তার দাবি, ওই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় পাঁচ বছরের চুক্তি ভেঙে মাত্র নয় মাসের মাথায় তার বিরুদ্ধে চেক সংক্রান্ত মামলা করা হয়।

এই মামলার জেরে গত বছরের ২০ মার্চ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায় তার একমাত্র নিশ্চিত আয়ের পথ। চাকরি হারিয়ে সংসারের চাকা থেমে যাওয়ার উপক্রম হয়। তখনই বাধ্য হয়ে জীবনযুদ্ধে নামেন তিনি।

সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে একটি ভ্রাম্যমাণ ভ্যান নিয়ে পর্যটকদের জন্য খাবার বিক্রি শুরু করেন। কখনো ভাজা নাস্তা, কখনো হালকা খাবার। এভাবেই দিন পার করছিলেন। তবে গত কিছুদিন ধরে প্রশাসনিক বিধিনিষেধ এবং রমজান শুরু হওয়ায় সেই ভ্যানের দোকানটিও বন্ধ রয়েছে।

ছেননুয়াইং রাখাইন জানান, ধর্ষণের চেষ্টা ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে তিনিও ভগ্নিপতি মেথোইন রাখাইনের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করেন।

তিনি বলেন, ‘পুলিশ তদন্ত করে তাকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে।’

এদিকে শিক্ষিকার পরিবার দাবি করছে, তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা ও আইনি চাপ সৃষ্টি করে পুরো পরিবারকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে।

ভুক্তভোগী শিক্ষিকার ছেলে অংঅং জুয়েল অভিযোগ করেন, বিষয়টি এখানেই থেমে থাকেনি। তার দাবি, মেথোইন রাখাইন নিজ মেয়েকে দিয়ে তাদের ঘর থেকে তার মায়ের ব্যাংকের চেকবই চুরি করিয়ে নেন। পরে সেই চেক ব্যবহার করে মেয়ের জামাই ক্যহিনের মাধ্যমে আরেকটি ভুয়া মামলা করার উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট একজন আইনজীবীর মাধ্যমে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়।

তিনি বলেন, ‘চেকবইটি চুরি হওয়ার বিষয়টি প্রথমে তার মা বুঝতে পারেননি। তবে নোটিশ পাওয়ার প্রায় চার মাস আগেই, ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট তিনি চেকবই হারানোর বিষয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে ওই লিগ্যাল নোটিশেরও যথাযথ জবাব দেওয়া হয়েছে।’

অংঅং জুয়েলের অভিযোগ, মেথোইন রাখাইন ও তার ছেলে কলেজ শিক্ষক জমাংনাইং একের পর এক ষড়যন্ত্র করে তাদের পরিবারকে বিপদে ফেলছেন।

তিনি বলেন, ‘মামলার চাপ আর দেনা শোধ করতে গিয়ে আমাদের বসতভিটাও অন্যের কাছে বিক্রি করতে হয়েছে। এখন শুনছি, মায়ের স্বাক্ষর নকল করে আরও টাকা নেওয়ার ভুয়া স্ট্যাম্পও আদালতে দেওয়া হয়েছে।’

বর্তমানে পরিবারটির অবস্থা খুবই নাজুক। সংসারে নিয়মিত আয় নেই। মেয়ের পড়াশোনাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলে জানান অংঅং জুয়েল।

তিনি বলেন, ‘কখনো খেয়ে, কখনো না খেয়ে দিন কাটছে। মায়ের চাকরি ফিরে না এলে কী হবে বুঝতে পারছি না।’

কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির (একাংশ) সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, স্কুল শিক্ষিকাকে ফাঁসানোর জন্য তরর ভগ্নিপতি পরিকল্পিতভাবে মামলাটি করেছেন। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।’

তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের উচিত বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করা এবং শিক্ষিকার পাশে দাঁড়ানো।’

কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহীন মিয়া বলেন, ‘ঘটনাটি অমানবিক ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে ধারণা পাওয়া গেছে। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে হয়েছে।’

তিনি জানান, মামলার নিষ্পত্তি দ্রুত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ভাঙা স্বপ্নের সামনে দাঁড়িয়ে সৈকতের বাতাসে সন্ধ্যা আরও গাঢ় হয়। পর্যটকদের ভিড় ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ভ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেননুয়াইং রাখাইনের চোখে তখনও লেগে আছে অশ্রু। একসময় তিনি শিশুদের হাতে বই তুলে দিতেন। আজ সেই হাতেই তুলে দিতে হয় ভাজা নাস্তার কাগজের প্যাকেট। তবু তার কণ্ঠে ক্ষীণ আশা, ‘আমি আবার স্কুলে ফিরতে চাই। আমার ছাত্রদের কাছে…।

মাসুম/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:

BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ info@bd24live.com
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ office.bd24live@gmail.com