অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া-এর সাবেক সহকারী একান্ত সচিব মোয়াজ্জেম হোসেনকে আনা সব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
আসিফ মাহমুদ যুব ও ক্রীড়া এবং পরে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার সময় মোয়াজ্জেম হোসেনকে এপিএস হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরে আসিফ মাহমুদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিলে মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে ৩১১ কোটি টাকার তদবির বাণিজ্য, নিয়োগ-বদলি সিন্ডিকেট এবং টেন্ডারবাজির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ ওঠে।
দুদক এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ ১১ মাসের অনুসন্ধান চালানোর পর কোনো প্রমাণ না পাওয়া গেলেও মোয়াজ্জেম হোসেনকে অব্যাহতি দিয়েছে। শুক্রবার (৬ মার্চ) নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি জানিয়েছেন, দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। পোস্টে তিনি নিষ্পত্তির সব ডকুমেন্টও সংযুক্ত করেছেন।
মোয়াজ্জেম লিখেছেন, “আলহামদুলিল্লাহ, দীর্ঘ ১১ মাসের অনুসন্ধানের পর দুদক প্রতিবেদন দিয়েছে এবং আমাকে সকল অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছে। ‘দুর্নীতি ও তদবির-বাণিজ্য’ সংক্রান্ত অভিযোগে কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় দুদক স্বসম্মানে আমাকে নিষ্পত্তিপত্র প্রদান করেছে।”
এপিএস হিসেবে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, “৫ আগস্ট পরবর্তী সরকারে আসিফ মাহমুদ দায়িত্ব নেওয়ার পর আমাকে এপিএস হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। স্থায়ী চাকরি পেলে ছেড়ে দেয়ার শর্তে আমি যোগদান করি। প্রথমে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং পরে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে তার দায়িত্ব ছিল।”
মোয়াজ্জেম হোসেন আরও বলেন, “প্রাথমিকভাবে কোনো বড় সমস্যা হয়নি। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর সমস্যা শুরু হয়। প্রতিদিন অনেকেই এখানে তদবির ও সুবিধা নেওয়ার জন্য আসতো। যখন সুবিধা দিতে অস্বীকার করা হয়, তখনই শত্রু সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে আমার ওপর ক্ষোভ বেশি জমেছে, কারণ সবাই আসিফ মাহমুদকে সরাসরি রিচ করতে পারত না।”
‘এরমধ্যে হুট করে একদিন কোনো এভিডেন্স ছাড়াই আওয়ামী লীগের পেজ থেকে পোস্ট হয় আমি ৩১১ কোটি টাকার তদবির বাণিজ্য করেছি! পরবর্তীতে লীগের পেজের ঐ পোস্টটাই হুবহু কয়েকটা জাতীয় দৈনিকে নিউজ করা হলো, দাঁড়ি-কমাসহ! সেইম হেডলাইনে,সেইম নিউজ, জাস্ট কপি-পেস্ট। মুহূর্তেই সোশ্যাল মিডিয়াতে সেটা ভাইরাল হয়ে গেলো।’
মোয়াজ্জেম বলেন, ‘প্রতাপশালীদের অন্যায্য সুবিধা দিতে না পারায় একটা ফেসবুক পোস্টের উপর ভিত্তি করে শত্রু হলাম পুরো দেশের, গালি খেলাম সবার, সমাজে হারালাম সম্মান। পুরো পরিবারকে বিব্রতকর পরিস্থিতেতে ফেলে দিলাম! এছাড়াও গণ-অভ্যুত্থানে পরাজিত শক্তি পুরোদমে এই প্রোপাগান্ডা কাজে লাগালো।’
দুদকের দীর্ঘ ১১ মাসের অনুসন্ধানের তাদেরকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন জানিয়ে তিনি লিখেন, ‘যখনই তারা ডেকেছে, গিয়েছি, জবাব দিয়ে এসেছি। সেটা করতে গিয়েও হয়রানির শিকার হয়েছি কিছু মিডিয়ার, হরে-দরে সেটা নিয়ে ফটোকার্ড বানিয়ে আমাকে নিয়ে প্রতি দিন নিউজ করতে থাকে। একেকদিন একেক সংখ্যায় নিউজ করতো, তাদেন ইচ্ছেমতো সংখ্যা বসিয়ে।’
‘অনেককেই ভয় দেখিয়ে, জোরপূর্বক অথবা অর্থের লোভ দেখিয়ে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য আদায় করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু মিথ্যা অভিযোগের বিপরীতে কোনো প্রমাণ কেউ হাজির করতে পারেনি।’
নিজের জীবনের মর্মান্তির ঘটনার কথাও স্ট্যাটাসে তুলে ধরেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার সাবেক এ এপিএস। তিনি লিখেন, ‘২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমি বাসার সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে আমার স্পাইনাল কর্ডের ভেতরে থাকা ফ্লুইড বের হয়ে যায়। সেটার সঠিক চিকিৎসা না হলে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে ডাক্তার আমাকে জানায়। এমতাবস্থায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আমাকে যেসব পর্যাপ্ত চিকিৎসা নিতে বলেছে তাও নিতে পারিনি, বাইরে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা নিতে তারা পরামর্শ দেন। কিন্তু, বিশেষ গোষ্ঠীর পত্রিকায় নিউজ হলো, দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে মোয়াজ্জেম। অর্থাৎ আমি পঙ্গু হয়ে গেলেও চিকিৎসা নিতে চাওয়াটা অন্যায়।’
‘অবশেষে দুদক দীর্ঘ অনুসন্ধান করে দুর্নীতির অভিযোগের কোনো সত্যতা না পেয়ে আমাকে মুক্তি দিয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ,’ স্ট্যাটাসে বলেন মোয়াজ্জেম।
মিথ্যা অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার পুরো পরিবারকেও হয়রানি করা হয়েছে উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাকে সামাজিকভাবে, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা হয়েছে গত ১টা বছর। আমার উপর হওয়া জুলুমের কোনো বিচার কি এই দেশে পাবো? হয়তো পাবো না, কিন্তু অনুরোধ থাকবে ফারদার আর হয়রানি ফেস করতে চাই না।’
মোয়াজ্জেম হোসেন নিজের ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “২ দিন আগে দেখলাম ‘আ জ কের প ত্রিকা’, ‘বা র্তা বাজার’সহ কিছু সংবাদমাধ্যম আমার গ্রামের অন্য একজনের নির্মাণাধীন বাড়িকে আমার নামে চালিয়ে দিয়ে নিউজ করেছে। ভাই, আর কতো? অন্যের বাড়িও আমার, অন্যের টাকাও আমার—এসব মিথ্যাচার থেকে কবে মুক্তি পাবো? আপনারা আমার পুরো পরিবারকেই তছনছ করে দিয়েছেন। দুঃখ লাগে, কষ্ট হয়, পরে ভাবি—এটিই জীবন। রাজার ছেলে রাজা হবে, আর তুমি সরকারি অফিসে বসবে কেন?”
তিনি আরও লিখেছেন, “কাউকে দোষী প্রমাণ করার আগেই মিডিয়া মানুষটিকে দোষী বলে ধরে নেয়, কারণ তারা আওয়ামী লীগের খেয়ে বিএনপির কোলে উঠে, বিশেষ সূত্র বা গোপন সূত্রের আজগুবি প্রমাণে কারো চরিত্র নষ্ট করতে সর্বদা ব্যস্ত থাকে। কোনো তথ্য বা প্রমাণের ধার তারা ধরেও না। এটাই কি সাংবাদিকতা?”
মোয়াজ্জেম প্রশ্ন তুলেছেন, “একজন মানুষকে ফেসবুক পোস্টের অভিযোগের ভিত্তিতে দিনের পর দিন মানসিক ও সামাজিক যন্ত্রণা দিয়ে কি প্রমাণ করতে চাচ্ছেন?” তিনি আরও লিখেছেন, “শক্তিশালীদের সঙ্গে সমঝোতা বা নেগোসিয়েশন না করা, কোনো অবৈধ সুবিধা দিতে না পারার কারণে আমি ভিক্টিম হয়েছি। আপনাদের বিশেষ সুবিধা দিতে পারিনি, তাই এত বিদ্বেষ ও প্রোপাগান্ডা! এত ক্ষোভ থাকলে গু/লি করে মে/রে দিতে পারেন, কিন্তু সামাজিকভাবে হেয় করবেন না। আমাকে এবং আমার পরিবারকে স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে দিন।”
তিনি জানিয়েছেন, দুদকের অনুসন্ধান ও নিষ্পত্তির সব ডকুমেন্ট তার পোস্টে সংযুক্ত করা হয়েছে। মোয়াজ্জেম লিখেছেন, “আমার জন্য দোয়া করবেন, যেন শান্তিপূর্ণভাবে বাঁচতে পারি। আর কারো জীবনে এমন মিথ্যা অভিযোগ ও হেনস্তার ভার যেন আর না আসে—এটাই আমি আশা করি।”
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর