সাভারের আশুলিয়ায় দারুল ইহসান ট্রাস্ট পরিচালিত তাহফিযুল কুরআনিল কারিম ফাজিল মাদ্রাসায় হামলা ও ভাংচুরের ঘটনায় দায়ের করা মামলার অন্যতম আসামি সংবাদ সম্মেলন করায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মামলার ২ নম্বর আসামি ও ঢাকা জেলা তাতীদলের সভাপতি মো. জাকির হোসেন সংবাদ সম্মেলন করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও তার বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগ ও ঘটনার প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) দুপুর ১২টার দিকে আশুলিয়ার বাইপাইল বসুন্ধরা এলাকায় সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। এসময় তিনি দাবি করেন, গত ৯ মার্চ আশুলিয়ার শ্রীপুরে দারুল ইহসান ট্রাস্টের মাদ্রাসায় হামলা ও ভাংচুরের ঘটনায় তাকে এবং আশুলিয়া থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী আব্দুল গফুর মিয়াকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে যে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে তা ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
এর আগে গত ৯ মার্চ বেলা ১১টার দিকে আশুলিয়ার শ্রীপুর এলাকায় অবস্থিত তাহফিযুল কুরআনিল কারিম ফাজিল (স্নাতক) মাদ্রাসায় এ হামলার ঘটনা ঘটে।
দাবিকৃত চাঁদা না পেয়ে মাদ্রাসায় দেশীয় অস্ত্রসহ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় গত বুধবার (১১ মার্চ) ভোররাতে মাদ্রাসার উপ-পরিচালক সৈয়দ সানজিদ বাদী হয়ে বিএনপির নেতাকর্মীসহ ৩৭ জনের নামে আশুলিয়া থানায় মামলাটি দায়ের করেন।
এমামলায় আশুলিয়া থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গফুর মিয়া ও ঢাকা জেলা তাঁতী দলের সভাপতি জাকির হোসেনসহ বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার অন্যান্য আসামিরা হলেন-জহিরুল ইসলাম ওরফে মুরগি জহির (৪৭), আব্দুল আলীম (৩২), আবু তাহের (৪০), হাবিবুর রহমান (৫২), মারুফ হোসেন মুকুল (৫৫), ডা. সালেহ উদ্দিন আহম্মেদ (৬০), মো. সজল (৩২), আজাহার (৪৮), সমির (৩০), সোহাগ (৩৫), সোলেমান (৪০), শরীফ শিকদার (৪৮), রুবেল (৩৮), মো. শাকিল (২২), লিটন প্রামানিক (২৮), সোহেল (২৮), রিপন মিয়া (৪৫), মোশারফ হোসেন (৪০), আবু তাহের দেওয়ান (৩৫), শামিম (৪৫), মাহে আলম (৫২), নাসির (৪০), মামুন (৩৫), মাসুদ (৪৮), আনিছ (৪০), সাইফুল ইসলাম (৩৫), গোলাপ (৪২), কউছার (৩০), সেলিম রেজা (৪২), রাজিব (৪৫), সিয়াম (২২), রনি (২৬), জামিল (২৫), হৃদয় মন্ডল (২৮) ও জামাল হোসেন (৩৩)। তারা সবাই আশুলিয়ার মধুপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, আশুলিয়া থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল গফুর দীর্ঘদিন ধরে মাদ্রাসার উপ-পরিচালক সৈয়দ সানজিদের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। চাঁদার টাকা না দিলে মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণাধীন কাঁচামালের আড়ত ও পাইকারি কাপড়ের মার্কেট জোরপূর্বক দখল করার হুমকিও দেন তিনি।
এজাহারে আরও বলা হয়, দাবিকৃত চাঁদা না দেওয়ায় গত সোমবার বেলা ১১টার দিকে আব্দুল গফুরের নির্দেশে অপর অভিযুক্ত জাকির হোসেন, জহিরুল ইসলাম ওরফে মুরগি জহির, মারুফ হোসেন মুকুল, ডা. সালেহ উদ্দিন আহম্মেদ ও সজলসহ ৫০-৬০ জন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মাদ্রাসায় অনধিকার প্রবেশ করে হামলা ও ভাঙচুর চালায়।
সংবাদ সম্মেলনে জাকির হোসেন বলেন, একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে তাদের নাম জড়িয়ে মিথ্যা নাটক সাজিয়ে সংবাদ প্রকাশ করিয়েছে। তিনি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান এবং দাবি করেন, হামলা ও ভাংচুরের ঘটনার সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওই হামলা ও ভাংচুরের ঘটনায় করা মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে এবং ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। মামলার তদন্ত চলমান থাকলেও অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করায় বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে প্রফেসর ড. সৈয়দ আলী আশরাফ (রহঃ)-এর ছোট ভাই ডা. সৈয়দ আলী রেজার ছেলে সৈয়দ আলী রায়হান বলেন, সৈয়দ আলী আশরাফ ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৬ সালে আশরাফ চ্যারিটেবল ট্রাস্ট গঠন করেন, যা মূলত একটি পারিবারিক ট্রাস্ট। পরবর্তীতে তিনি আশরাফ চ্যারিটেবল ট্রাস্ট এবং তার প্রতিষ্ঠিত আরও দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দারুল ইহসান ট্রাস্ট গঠন করেন। এ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার সময় সংশ্লিষ্টরা নিজেদের জমি দান করেন।
তিনি আরও বলেন, তাদের পরিবার কখনোই দারুল ইহসান ট্রাস্ট পরিচালনায় হস্তক্ষেপ করেনি। তবে দীর্ঘদিন ধরে দারুল ইহসান ট্রাস্টের ধানমন্ডি গ্রুপ ও ৪ নম্বর দারুল ইহসান ট্রাস্ট (রেজিস্টার্ড) সাভার গ্রুপের মধ্যে দখল ও পাল্টা দখলের ঘটনা ঘটে আসছিল।
সৈয়দ আলী রায়হান অভিযোগ করে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মারুফ হোসেন মুকুল, জাহাঙ্গীর কবির নানকের সহায়তায় ২০১২ সালে তাদের ধানমন্ডিতে যাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদ সদস্য সাইফুলের সহযোগিতায় তাদের সাভারেও আসা বন্ধ করে দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও তারা সাভারে আসেননি।
তিনি বলেন, তবে গত বছর জানুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে অনুরোধ করেন প্রতিষ্ঠানটি বাঁচানোর জন্য। এরপর তারা মাদ্রাসায় গিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন এবং দারুল ইহসান ট্রাস্ট সাভার গ্রুপের তথাকথিত ম্যানেজিং ট্রাস্টি মারুফ হোসেন মুকুলের সঙ্গে আলোচনায় বসার চেষ্টা করেন। কিন্তু বারবার প্রস্তাব পাঠিয়েও কোনো সাড়া না পাওয়ায় তারা মাদ্রাসার দায়িত্ব নিতে বাধ্য হন।
তিনি দাবি করেন, তাদের বিরুদ্ধে যে অপবাদ দেওয়া হচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।
এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। মাদ্রাসায় হামলা ও ভাংচুরের ঘটনায় দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সংবাদ সম্মেলনে তাতী দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও আশুলিয়ায় কর্মরত বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) আরাফাতুল ইসলাম বলেন,এই হামলার ঘটনায় ইতোমধ্যে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্তের জন্য মামলাটি বর্তমানে ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ঢাকা জেলা উত্তর ডিবির অফিসার ইনচার্জ মো. সাইদুল ইসলাম বলেন,হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি এখনো আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়নি। মামলাটি আমাদের কাছে আসার পরপরই জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তারে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা ও অভিযান পরিচালনা করা হবে।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর