গোধূলির আলো ধীরে ধীরে নেমে আসছে সমুদ্রের বুকে। দিগন্তে ডুবতে থাকা সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে ঢেউয়ের গায়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে বালিয়াড়ির ওপর সাদা কাপড় বিছিয়ে সারি করে বসে পড়েছেন কয়েকজন মানুষ। সামনে সাজানো খেজুর, শরবত, ফল আর নানা পদের ইফতারি। ঢেউয়ের মৃদু গর্জন আর নোনাধরা বাতাসের মধ্যে অপেক্ষা- সূর্য ডোবার। আজানের ধ্বনি উঠলেই প্রকৃতির এই অবারিত প্রাঙ্গণেই শুরু হবে ইফতার।
এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের উখিয়ার সোনারপাড়া-পাটোয়ারটেক সৈকতের। রমজান মাস এলেই এমন দৃশ্য এখন প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কক্সবাজারের বিভিন্ন সৈকতে।
পরিবার, বন্ধু কিংবা সহকর্মীদের নিয়ে মানুষজন বালিয়াড়িতে বসে অপেক্ষা করেন সূর্যাস্তের- তারপরই প্রকৃতির মাঝেই শুরু হয় ইফতার। সৈকতে ছোট ছোট ইফতার আড্ডা বিকেলের দিকে কক্সবাজার সৈকতের বালিয়াড়িতে তৈরি হয় ছোট ছোট ইফতার আড্ডা।
কেউ পাটি বিছিয়ে বসেছেন, কেউ আবার সাদা কাপড়। একেকটি দলে ১০ থেকে ১৫ জন নারী-পুরুষ। কেউ বাড়ি থেকে আনা তরমুজ, ছোলা, খেজুর ও ফলমূল সাজাচ্ছেন। কেউ মুড়ি, পেঁয়াজু, জিলাপি আর শসা কাটছেন। চারদিকে নীরব সৈকত, কেবল ঢেউয়ের মৃদু গর্জন আর হাসি-গল্পের শব্দ। সূর্য ডোবার অপেক্ষায় সবাই।
কক্সবাজার শহরের বাহারছড়া এলাকার যুবক নজরুল ইসলাম বন্ধুদের নিয়ে এসেছেন সৈকতে ইফতার করতে।
তিনি বলেন, প্রতিদিন তো বাসায় ইফতার করা হয়। কিন্তু খোলা আকাশের নিচে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে ইফতার করলে আলাদা একটা ভালো লাগা কাজ করে। তাই আজ সৈকতে চলে এলাম।
বন্ধুদের সঙ্গে নয়, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সৈকতে এসেছেন তরুণী ইসরাত জাহান। তিনি বলেন, গত বছর বন্ধুদের সঙ্গে একবার এখানে ইফতার করেছিলাম। সমুদ্রের ঢেউ আর সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে ইফতার করার অনুভূতিটা খুব সুন্দর। তাই এবার পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসেছি।
শুধু সোনারপাড়া বা পাটোয়ারটেক নয়, কক্সবাজারের লাবণি, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টেও এখন প্রায় প্রতিদিন দেখা যায় এমন দৃশ্য। মেরিন ড্রাইভের হিমছড়ি, ইনানী কিংবা টেকনাফ সৈকতেও অনেকেই ইফতার করতে ছুটে আসছেন। প্রতিদিন অন্তত ৪০ থেকে ৫০টি দল সৈকতে বসে ইফতার করছে বলে জানান স্থানীয়রা। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবারে সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা, সামাজিক সংগঠন কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা দল বেঁধে চলে আসেন সমুদ্রের ধারে।
রমজান মাসে কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা সাধারণত কম থাকে। তবে এই সময়টিকে নতুনভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। অনেক হোটেল ও রিসোর্ট পর্যটকদের জন্য বিশেষ ছাড় দিচ্ছে। কেউ আয়োজন করছে সৈকতে ব্যুফে ইফতার, কেউ আবার ঘোষণা করেছে বিশেষ ইফতার প্যাকেজ।
কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, রমজানে কক্সবাজারের পরিবেশ অনেক শান্ত থাকে। এখন অনেক হোটেল ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে। যারা কোলাহলমুক্ত পরিবেশে সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য এই সময়টা খুব ভালো।
মেরিন ড্রাইভের প্যাঁচারদ্বীপ সৈকতে অবস্থিত পরিবেশবান্ধব মারমেইড বিচ রিসোর্টে আয়োজন করা হয়েছে ব্যুফে ইফতার। এখানে প্রায় ২৫ ধরনের ইফতারি রাখা হয়েছে।
রিসোর্টটির ব্যবস্থাপক ইয়াসির আরাফাত রিশাদ বলেন, দেশি-বিদেশি পর্যটক ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সদস্যরা দল বেঁধে এখানে ইফতারে অংশ নিচ্ছেন।
রমজানে পর্যটনের সম্ভাবনা কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার মনে করেন, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখেও রমজানে পর্যটনকে সক্রিয় রাখা সম্ভব।
তিনি বলেন, বিশেষ ছাড়ে হোটেলে থাকার সুযোগ, মানসম্মত ইফতার ও সাহ্রির প্যাকেজ এবং সৈকতে বসে ইফতারের আয়োজন করলে পর্যটকেরা রমজানেও কক্সবাজারে আসবেন।
সূর্যাস্তের সঙ্গে এক অনন্য অনুভূতি ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছেন কেফায়েত উল্লাহ।
তিনি বলেন, কম ভাড়ায় হোটেলে থাকার সুযোগ পেয়েছি। পরিবেশও খুব শান্ত। প্রতিদিন সৈকতে বসে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে ইফতার করছি। এটা সত্যিই নতুন অভিজ্ঞতা।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। সূর্য ডুবে গেলে আকাশের লাল আভা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দের মধ্যে ভেসে ওঠে মাগরিবের আজান।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর