চাদার পুরো টাকা না পেয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য, গ্রাম পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে স্কুল দপ্তরি পঞ্চানন বর্মণকে ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘটেছে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ভুল্লী থানার বালিয়া ইউনিয়নের কিসামত শুখানপুকুরীর ময়না পাড়া গ্রামে।
পঞ্চানন বর্মণ (৩৫) কৃষ্ট নারায়ণ বর্মণের ছেলে ও পেশায় স্কুল দপ্তরি। গত বুধবার (৪ মার্চ) তিনি ৭ জনের বিরুদ্ধে ঠাকুরগাঁও সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে চাদাবাজির মামলা দায়ের করেন। মামলার আসামিরা হলেন, মৃত হরগোবিন্দ বর্মণের ছেলে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মলিন্দ্র নাথ, সিংগিয়া গ্রামের আহসান হাবিবের ছেলে ও বালিয়া ইউপি সদস্য আলমগীর হোসেন গয়া, মৃত বিপিন বর্মণের ছেলে গ্রাম পুলিশ পরেশ চন্দ্র, সাবেক ইউপি সদস্য নীলেন্দ্র নাথের ছেলে সেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি প্রদীপ চন্দ্র বর্মণ, হরিকিশোর বর্মণের স্ত্রী মুক্তি রানী, তার ছেলে রতন চন্দ্র ও স্ত্রী রিনা রানী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৫ ফেব্রুয়ারি আলুর ক্ষেতে কাজের জন্য রিনা রানীকে ডাকতে যান পঞ্চানন। রিনা পরে আসবেন বলে জানান। পাশেই কাজ করছিলেন তার নানী ধলেশ্বর বালা। পরে পঞ্চানন বাড়ি ফিরে আসেন। সন্ধ্যার পর রিনার স্বামী ও পরিবারের লোকজন অভিযোগ তোলে, বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে পঞ্চানন ধর্ষণ করেছেন। বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে গেলে ইউপি সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা ‘সালিশি’ বসান। সালিশে তারা রিনার পক্ষে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। পঞ্চানন ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করলে লাঠিসোটা দিয়ে ভয়ভীতি দেখানো হয়। আপোষের নামে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেন উভয় পক্ষ এবং ৫ লাখ টাকার ফাঁকা চেক ও ৩০ হাজার টাকা নগদ নেন অভিযুক্তরা।
অভিযোগ রয়েছে, এসব টাকা ভুক্তভোগীকে না দিয়ে ইউপি সদস্য, গ্রাম পুলিশ ও স্থানীয় নেতারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করেন। পরদিন পুনরায় টাকা দাবি করা হলে পঞ্চানন অস্বীকার করলে তাকে মামলা দিয়ে হুমকি দেওয়া হয়। এরপর ৪ মার্চ পঞ্চানন চাদাবাজির মামলা দায়ের করেন। পরে ১০ মার্চ আসামিরা রিনা রানীর মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। ভুল্লী থানা ১৬ মার্চ তদন্তে নির্দেশ পেলে পুলিশ পরদিন পঞ্চাননকে গ্রেপ্তার করে।
স্থানীয়রা জানান, ধর্ষণ ঘটলে রাতারাতি কেন সালিশ বসানো হলো এবং ৫ লাখ টাকার চেক কে নিল? রিনা রানী তার এজাহারে দাবি করেন গত মাসের ১৫ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ঘরের কাজ শেষে বিশ্রাম নেওয়ার সময় তাকে একা পেয়ে পঞ্চানন ধর্ষণ করেন। ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি ভুল্লী থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে গেলে ওসি ‘আজ-কাল’ বলে সময়ক্ষেপণ করেন এবং ৫ মার্চ তাকে আদালতে মামলা করতে পরামর্শ দেন। তবে পুলিশ বলছে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ‘রিনা রানী’ নামে কেউ থানায় কোনো অভিযোগ দিতে আসেননি।
অন্যদিকে, ঘটনার পর থেকেই বাদী রিনা রানী বাবার বাড়ি চলে যায়। আর তার স্বামী প্রতিবেদকের কথা শুনে সটকে যায়। পরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে তার নানী বৃদ্ধা ধলেশ্বর বালা জানান, সেদিন পঞ্চানন এসেছিল আমাদের বাড়িতে। ডাকাডাকির পর চলে যায়। আর আমি ঘরের পেছনে কাজ করছিলাম। কই কিছু হলে তো আমি জানতাম।
পঞ্চাননের পরিবার ও স্থানীয়রা বলেন, রিনার পরিবার দিনমজুরের কাজ করে এবং পঞ্চানন শুধু তাকে কাজে ডাকতে গিয়েছিলেন। এর পর রাতে হঠাৎ তারা অভিযোগ তুলল পঞ্চানন নাকি রিনাকে ধর্ষণ করেছে! বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। পঞ্চাননকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। সেদিন রাতেই মেম্বার হাতে লাঠি নিয়ে ভয়-ভীতি দেখিয়ে টাকার পাশাপাশি সাদা কাগজে ‘আপস’ নামে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। কিন্তু আমাদেরকে কোনো নথির কপি দেওয়া হয়নি।
যুবদলের অর্থ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী সরকার বলেন, ঘটনা সন্দেহজনক। সামান্য ঘটনাকে গয়া মেম্বারসহ আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ইচ্ছে করে বড় করেছে শুধু টাকা খাওয়ার জন্য। যদি সত্যিই ওই মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকে তাহলে ডাক্তারি পরীক্ষা হওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু তাকে কোনো মেডিকেল পরীক্ষা করানো হয়নি এটাই প্রমাণ করে ঘটনাটি সন্দেহজনক। আবার ধর্ষণ হলে ওই দিনই থানায় অভিযোগ না করে স্থানীয়ভাবে টাকার বিনিময়ে আপস করার প্রশ্নই আসে না। শুনেছি তারা টাকা-পয়সাও নিয়েছে। আমরা চাই, পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক। মেয়েটির সাথে যদি প্রকৃতপক্ষে খারাপ কিছু ঘটে থাকে, তাহলে গয়া মেম্বারসহ যারা রাতারাতি ‘সালিশ’ করে আপস করলো, তারা কোন আইনের ভিত্তিতে এমন করলো? তাদের এই অধিকার কে দিল?
গ্রাম পুলিশ পরেশ চন্দ্র বলেন, যা ইউপি সদস্য গয়া বলেছেন তাই করেছি।
অভিযোগ প্রসঙ্গে ইউপি সদস্য আলমগীর হোসেন গয়া এর সাথে কথা বলতে গেলে তিনি ভুল্লী থানার ওসির অনুমতি ছাড়া সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলবেন না বলে জানান। পরে তিনি বলেন, ঐ ঘটনায় একটি আপোষনামা আমি করে দিয়েছি। সবাই আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিল। মেয়েটাকে কয়েক দিন পর ডাক্তারি পরীক্ষা করা হয়েছে। আমাদের কাছে সব তথ্য আছে। আর যে টাকা নেওয়া হয়েছে সব টাকা মেয়ের পরিবারকে দেওয়া হয়েছে। তবে ফাঁকা চেক ও সাদা কাগজে সাক্ষরযুক্ত আপোষনামার কাগজটি ডাঃ ফারুকের কাছে রয়েছে।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইমরান হোসেন চৌধুরী বলেন, ধর্ষণ একটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। আইন অনুযায়ী এ ধরনের মামলায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা ব্যক্তির সালিশ বা আপস করার সুযোগ নেই। অভিযোগ উঠলে বিষয়টি পুলিশ তদন্ত করবে এবং আদালত বিচার করবে এটাই আইনগত প্রক্রিয়া।
তিনি আরও বলেন, থানায় অভিযোগ না নেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সাধারণত ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতার অভিযোগ পেলে পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। আর ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর নিয়ম রয়েছে। তাছাড়া ফরেনসিক দিক থেকে ধর্ষণের আলামত সবচেয়ে কার্যকরভাবে পাওয়া যায় ঘটনার ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে। তাই এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত মেডিকেল পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে বালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্রো চৌধুরী বলেন, ঘটনার সাত দিন পর আমি বিষয়টি জানতে পারি। তখনই স্পষ্ট করে বলেছি ধর্ষণ মামলার বিচার করার ক্ষমতা ইউনিয়ন পরিষদের নেই। এটি সম্পূর্ণভাবে আদালতের বিষয়। টাকা-পয়সা লেনদেনসহ আরও কিছু অভিযোগ আমি শুনেছি। তবে এসব বিষয়ে আইনগতভাবে তদন্ত হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. খোদাদাদ হোসেন বলেন, ঘটনাটি আমাদের নজরে এসেছে। আদালতের নির্দেশে পুলিশ তদন্ত করছে। অভিযোগ সত্য কি-না তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে। ধর্ষণের মতো গুরুতর মামলায় কোনো ধরনের আপস বা সালিশ আইনসম্মত নয়। কেউ যদি এ ধরনের কাজ করে থাকে, সেগুলোও তদন্তের আওতায় আসবে। আমরা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে ঘটনাটি যাচাই করছি এবং তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা যাচাই করেছি রিনা রানী নামে কেউ ভুল্লী থানায় কোনো অভিযোগ করেননি বা আসেননি। তিনি মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। অনেক সময় থানায় না এসেও বলে থানা তার অভিযোগ গ্রহণ করেনি। তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর