বগুড়ার শেরপুর উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের বাঘমারা গ্রামে এক বিস্তীর্ণ সবুজ ধানের ক্ষেতের মাঝে একাকী দাঁড়িয়ে আছে বাঘমারা শান্তি নিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নামের সাথে 'শান্তি' শব্দটি যুক্ত থাকলেও, এই স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনে কোনো শান্তি নেই, আছে কেবলই এক বুক হতাশা। লোকালয় থেকে বেশ খানিকটা দূরে, মির্জাপুর ও শাহবন্দেগী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী আদিবাসী গ্রামের পাশে স্কুলটির অবস্থান। উন্নয়নের ছোঁয়া এড়িয়ে যাওয়া এই বিদ্যাপীঠে পৌঁছানোর জন্য নেই কোনো রাস্তা।
প্রতিদিন কোমলমতি শিশু ও শিক্ষকদের স্কুলে পৌঁছাতে হয় ধানক্ষেতের সরু, আঁকাবাঁকা ও বিপজ্জনক আইল ধরে। শুষ্ক মৌসুমে কোনোমতে এই পথ পার হওয়া গেলেও, বৃষ্টির দিনগুলো এখানে নিয়ে আসে এক ভয়ংকর বিভীষিকা। বৃষ্টি হলেই ক্ষেতের আইল পিচ্ছিল কাঁদায় পরিণত হয়। একটু পা হড়কালেই সোজা জল-কাদায় পূর্ণ ধানক্ষেতে পড়ে যেতে হয়। কাঁদা মেখে, বই-খাতা ভিজিয়ে, জামাকাপড় নষ্ট করে প্রতিদিন কত শিশু যে মাঝপথ থেকে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে যায় তার কোনো হিসেব নেই। শিক্ষকদের অবস্থাও তথৈবচ। জুতো হাতে নিয়ে, প্যান্ট গুটিয়ে, একহাঁটু কাঁদা পেরিয়ে তাদের স্কুলে পৌঁছাতে হয়।
এই করুণ অবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্কুলের অস্তিত্বের ওপর। যাতায়াতের এমন ভয়াল রূপ দেখে অনেক অভিভাবকই তাদের সন্তানদের এই স্কুলে পাঠাতে অনীহা দেখাচ্ছেন। ফলে একদিকে যেমন প্রাথমিকে পড়ানোর প্রতি অভিভাবকদের অনীহা বাড়ছে, অন্যদিকে যাতায়াত ব্যবস্থার অভাবে এই স্কুলটি হারাচ্ছে তার শেষ প্রাণচাঞ্চল্যটুকুও। আশেপাশের আদিবাসী গ্রামগুলোর খেটে খাওয়া মানুষদের স্বপ্ন ছিল, তাদের সন্তানরা অন্তত অক্ষরজ্ঞান শিখবে, মানুষের মতো মানুষ হবে। কিন্তু একটি রাস্তার অভাবে সেই স্বপ্নগুলো আজ ধানক্ষেতের কাঁদায় মুখ থুবড়ে পড়ছে।
বাঘমারা শান্তি নিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম বলেন, "আমরা খুব কষ্ট করে স্কুলে যাতায়াত করি। শিক্ষার্থীদের ধরে রাখা খুব কষ্ট। শুধু রাস্তা না থাকায়। ওয়াশব্লক ও শহীদ মিনার তৈরির সরঞ্জাম আনতে সমস্যা হয়। যার ফলে এগুলো এখন হয়নি। অন্য প্রায় সব স্কুলে হয়েছে।"
এ ব্যাপারে শিক্ষা অফিসার আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, "রাস্তার জন্য আবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বিষয়টি।"
একটি রাস্তা, মাত্র একটি রাস্তা কি পারে না এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো স্কুলটিকে মূল স্রোতের সাথে যুক্ত করতে? পারে না কি অবহেলিত ওই শিশুগুলোর মুখে একটু হাসি ফোটাতে? যতদিন না ধানের ক্ষেত চিরে একটি মজবুত রাস্তা এই স্কুলটির দরজায় গিয়ে পৌঁছাচ্ছে, ততদিন 'শান্তি নিকেতন' নামটি এই গ্রামের মানুষের কাছে কেবলই এক নিষ্ঠুর উপহাস হয়েই থাকবে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর