প্রশাসন থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, লামা উপজেলায় সরকার অনুমোদিত কোনো বালু মহাল নেই। অথচ উপজেলার ফাঁসিয়াখালী, একটিমাত্র ইউনিয়নে দুই শতাধিক পয়েন্ট থেকে বালু উত্তোলন চলমান রয়েছে। প্রতিদিন এইসব পয়েন্ট থেকে কয়েক হাজার গাড়ি অবৈধ বালু পাচার হচ্ছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে অবৈধ বালু বাণিজ্যেও হয়েছে হাতবদল। রাজনৈতিক মাঠে দলের বিভেদ থাকলেও অবৈধ বালু উত্তোলনে সবাই মিলেমিশে একাকার।
বান্দরবান জেলার লামা উপজেলা ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের অন্যতম পানির উৎস হারগাজা ছড়া, বাইশারী খাল, ফাঁসিয়াখালী খাল, বগাইছড়ি ছড়া সহ ফকিরাখোলা, কাম্মারঝিরি, সাপেরঘারা, কুরুকপাতা ঝিরি, লাইল্যারমার পাড়া, ত্রিশডেবা, কমিউনিটি সেন্টার, বগাইছড়ি, বড়ছনখোলা, কুমারী চাককাটা, পেতাইন্নাছড়া এলাকা থেকে গত ১৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় থাকা প্রভাবশালীরা বালু তুলছিল। সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বালুর বাণিজ্য চলে গেছে বিএনপির প্রভাবশালীদের হাতে। ৫ আগস্ট বিগত সরকারের পতনে ক্ষতিগ্রস্তরা এই ভেবে আশাবাদী হয়েছিলেন যে, দীর্ঘদিন ধরে চলা বালু-দস্যুতা এবার হয়ত বন্ধ হবে। কিন্তু এখনো আরো বিশাল পরিসরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবৈধভাবে বালু তুলছে প্রভাবশালী মহলটি। দুই শতাধিক পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন কয়েক হাজার গাড়ি অবৈধ বালু পাচার হচ্ছে।
সরজমিনে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড ফকিরাখোলা এলাকার কাম্মারঝিরি বিলে দেখা যায়, সবুজ ধানের মাঠ ও পাহাড়ের পাশে জমিতে বিশাল গর্ত করে পানি দিয়ে সেলু মেশিনে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। একদিক থেকে বালু উত্তোলন হচ্ছে অন্যদিক ভেঙ্গে যাচ্ছে ফসলের জমি। এভাবে বিস্তৃর্ণ ফসলের মাঠ এখন যুদ্ধ বিধ্বস্ত এলাকার মত ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। এখানে বালু উত্তোলন করছে অত্র গ্রামের মৃত মোস্তাক আহমদ প্রকাশ মমতাজ আহমদের ছেলে ফজল করিম মনু। তারসাথে জড়িত তার ছেলে রেজাউল করিম, শফিউল করিম এবং মহিউদ্দিন, জাফর আলম। প্রতিদিন এই পয়েন্ট থেকে কয়েকশত ট্রাক বালু পাচার হয়।
স্থানীয়রা আরও জানায়, বালু উত্তোলনের ফলে নদী-খালগুলোর স্বাভাবিক গতি হারিয়ে গেছে। পাহাড়ধস, বসতবাড়ি, ফসলি জমি বিলীনের পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে খালগুলোতে পানি শুকিয়ে যায়। উত্তোলিত বালু বড় বড় ট্রাকে পাচার করতে গিয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ব্রিজ, কালভার্ট, সড়কগুলো ভেঙ্গে তছনছ হয়ে যাচ্ছে। বালু পরিবহনে ধূলাবালিতে এলাকার মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। এলাকাবাসী পরিবেশ অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে অবগত করেও কোন প্রতিকার পাচ্ছেনা।
স্থানীয় গৃহবধূ নুরজাহান বেগম বলেন, ‘খাল থেকে বালি তোলার কারণে পানি কমার পাশাপাশি ফসলি জমির ভাঙন দেখা দিয়েছে। আবার বালু পরিবহনের কারণে সড়কের প্রায় স্থানের দু’পাশ দেবে গেছে। দুইটি ব্রিজ ইতিমধ্যে ধসে গেছে। দ্রুত বালু পরিবহনের গাড়ি চলাচল বন্ধ করা না হলে অচিরেই সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। অবিলম্বে ‘বালু খেকোদের’ দমন করতে না পারলে নদীভাঙন আরো প্রকট আকার ধারণ করবে।’ ফকিরাখোলা এলাকার ছানাউল্লাহ নামে এক ব্যক্তি জানান, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে বালু এনে পাশর্^বর্তী চকরিয়া উপজেলার ডুলহাজারা ইউনিয়নের পাগলির বিলে বড় বড় স্তুপ করে রাখা হয়। পরে সেখান থেকে পাচার হয় বালু।
ফকিরাখোলা, হারগাজা ও বগাইছড়ি বাজারের কয়েকজন দোকানি বলেন, বালুর গাড়ির ধূলায় চোখ-মুখ বন্ধ করে থাকতে হয়। দোকান করাই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়রা জানান, প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই অবৈধ বালু উত্তোলন চলছে।
লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের প্রশাসক মোঃ মঈন উদ্দিন বলেন, বালু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেও বালু উত্তোলন ও পরিবহন বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছেনা। ট্রাস্কফোর্সের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য আমরা জেলা প্রশাসনের কাছে জানিয়েছি। খুব শিগগিরই বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরকে নিয়মিত মামলা নিতে বলা হয়েছে।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর