• ঢাকা
  • ঢাকা, শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ১ সেকেন্ড পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১১ এপ্রিল, ২০২৬, ০৪:৩২ দুপুর

কেয়ারী ঘাটের শ্রমিক থেকে ইয়াবা সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রক ফারুক

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

মাথায় টুপি, গালে পরিপাটি দাঁড়ি, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি। চলাফেরা ও কথাবার্তায় ধর্মীয় আবহ- প্রথম দেখায় তাকে অনেকেই একজন মাদ্রাসার শিক্ষক কিংবা ধর্মভীরু সাধারণ মানুষ বলেই মনে করবেন। কিন্তু এই সাদামাটা চেহারার আড়ালেই লুকিয়ে আছে সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত এক ইয়াবা সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রক। টেকনাফের আলোচিত এই ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ ফারুক।

স্থানীয়দের দাবি, টেকনাফ সদরের নতুন পল্লান পাড়ার জরাজীর্ণ একটি ঘরে বসবাস করতেন ফারুক। বাবা ফজল করিম ছিলেন কৃষক। অভাব-অনটনের সংসারে বেড়ে ওঠা ফারুকের শৈশব কেটেছে অনিশ্চয়তা আর টানাপোড়েনের মধ্যে। নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগও পাননি। জীবিকার তাগিদেই খুব অল্প বয়সে তাকে নেমে পড়তে হয় কাজে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জীবনের শুরুটা হয়েছিল টেকনাফের কেয়ারী ঘাটে শ্রমিক হিসেবে। সেখানেই বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় গড়ে ওঠে। ধীরে ধীরে সীমান্তঘেঁষা কিছু ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

প্রথমে ছোট পরিসরে যুক্ত থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই ফারুক নিজস্ব একটি চক্র গড়ে তোলেন বলে দাবি স্থানীয়দের। মিয়ানমার সীমান্তকে কেন্দ্র করে ইয়াবা পাচার, বাহক নিয়ন্ত্রণ, রুট ব্যবস্থাপনা- সবকিছুতেই সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার প্রভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, অনেকে তাকে টেকনাফ সীমান্তের ‘মাফিয়া’ হিসেবেই অভিহিত করতে শুরু করেন।

একজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, ঘাটে কাজ করতে করতে ওর বাইরের লোকজনের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে দেখি, সেই পরিচয়ই তাকে অন্য জগতে নিয়ে গেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ফারুকের আগের জীবন আর বর্তমান অবস্থার মধ্যে রয়েছে বিস্ময়কর পার্থক্য। অল্প সময়ের ব্যবধানে তার আর্থিক অবস্থার এমন পরিবর্তন অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।

একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, শুরুতে হয়তো ছোটভাবে জড়িয়েছিল। কিন্তু পরে নিজেই বড় হয়ে গেছে। এখন সে নিজেই পুরো নেটওয়ার্ক চালায়।

অভিযোগ রয়েছে, ফারুকের নেতৃত্বে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যেখানে বিভিন্ন স্তরে লোকজন যুক্ত রয়েছে। বাহক থেকে শুরু করে সরবরাহকারী ও রুট নিয়ন্ত্রণকারী- সবই এই চক্রের অংশ। সহজে অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে এলাকার অনেক তরুণ এতে জড়িয়ে পড়ছে।

একজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার ছেলে আগে ভালো ছিল। পরে ওদের সঙ্গে মিশে সব নষ্ট হয়ে গেছে। এখন মামলায় জড়িয়ে জীবনটাই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

আরেকজন স্থানীয় যুবক বলেন, অনেকে টাকা দেখে এই লাইনে ঢুকে পড়ে। কিন্তু একবার ঢুকলে আর বের হওয়া যায় না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা বড় মাদক কারবারিদের সঙ্গে ফারুকের যোগাযোগ ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক সম্পর্কে রূপ নেয়। সেই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই তিনি ইয়াবা পাচারের বড় পরিসরে যুক্ত হয়ে পড়েন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, সীমান্ত এলাকায় মাদক কারবার দীর্ঘদিনের একটি জটিল সমস্যা। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে বাহকদের আটক করা হলেও মূল নিয়ন্ত্রকরা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।

স্থানীয় এক সাবেক জনপ্রতিনিধি বলেন, ছোটখাটো বাহকদের ধরা হয়, কিন্তু বড় খেলোয়াড়রা আড়ালেই থেকে যায়। এ কারণেই সমস্যাটা থেকে যাচ্ছে।

পুলিশের নথি বলছে, ফারুকের বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র, হত্যা ও মানব পাচারসহ প্রায় এক ডজন মামলা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে ফারুকের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে বর্তমানে সাতটি মামলা রয়েছে।

এই তথ্যের বৈপরীত্য নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। একজন শিক্ষক বলেন, মামলার সংখ্যা নিয়েই যদি দ্বন্দ্ব থাকে, তাহলে বোঝা যায় বিষয়টা কতটা জটিল।

সম্প্রতি একটি ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় আসেন ফারুক। কয়েক মাস আগে টেকনাফের ইমামের ডেইল এলাকায় তার মালিকানাধীন একটি টয়োটা এক্সকরোলা গাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা জব্দ হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এই ঘটনার পরই বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনায় আসে।

টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের মালিক সমিতির এক সদস্য বলেন, ওই গাড়ি আটকের পর সবাই বুঝতে পারে, বিষয়টা বড়। এটা একা কারও পক্ষে করা সম্ভব না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক কারবার থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে ফারুক এলাকায় বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। পল্লান পাড়ায় নামে-বেনামে জমি কেনা, ব্যক্তিগত গাড়ি সংগ্রহ- সব মিলিয়ে তার সম্পদের পরিমাণ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

একজন ভূমি-সংক্রান্ত কাজে জড়িত ব্যক্তি বলেন, এখানে অনেকেই নামে-বেনামে জমি কেনে। কিন্তু অল্প সময়ে এত সম্পদ করা স্বাভাবিক না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাদক সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি জানান, এই ধরনের ব্যবসা একা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এর পেছনে একাধিক স্তরের সমন্বিত নেটওয়ার্ক কাজ করে, যা গড়ে তুলতে সময় ও প্রভাব দুটোই প্রয়োজন।

তাদের ভাষ্য, ফারুক সেই কাঠামো তৈরি করতে পেরেছেন বলেই এত দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। স্থানীয়দের মতে, ফারুকের উত্থান শুধু একজন ব্যক্তির গল্প নয়; এটি সীমান্ত অঞ্চলের একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যেখানে দারিদ্র্য, দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভ, সীমান্তের ভৌগোলিক সুবিধা এবং প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া একসঙ্গে কাজ করে।

এলাকাবাসী বলছেন, যতদিন বড় পর্যায়ের নিয়ন্ত্রকদের আইনের আওতায় আনা না হবে, ততদিন এ ধরনের নেটওয়ার্ক বন্ধ হবে না। একজনকে সরালেও তার জায়গায় আরেকজন উঠে আসবে। সব মিলিয়ে, কেয়ারী ঘাটের এক সময়ের শ্রমিক মোহাম্মদ ফারুক এখন টেকনাফের আলোচিত ও বিতর্কিত একটি নাম। তার উত্থানের গল্পে যেমন রয়েছে ব্যক্তিগত পরিবর্তনের নাটকীয়তা, তেমনি রয়েছে সীমান্তভিত্তিক অপরাধ জগতের গভীর ও জটিল বাস্তবতা।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফারুক। তার দাবি, তিনি বৈধ ব্যবসার মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করেছেন এবং নানা অনিয়মের প্রতিবাদ করায় তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, তাকে আমরা নজরদারিতে রেখেছি। যেকোন সময় তাকে আইনের আওতায় আনা হয়ে।

মাসুম/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:

BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ info@bd24live.com
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ office.bd24live@gmail.com