জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক নিয়োগে আওয়ামী লীগপন্থী প্রভাব থাকার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, মেধা ও একাডেমিক যোগ্যতার তুলনায় রাজনৈতিক পরিচয় ও আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে দলীয়করণের শিকার হয়েছে।
২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার জগন্নাথ কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করে। তবে ২০০৬ সালের পর থেকে টানা প্রায় ১৭ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সামনে আসে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এ সময়ে এমন অনেক শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন, যাঁরা দেশের অন্যান্য স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়ার মতো অবস্থানে ছিলেন না। অভিযোগ রয়েছে, এসব নিয়োগে একাডেমিক দক্ষতা ও গবেষণার মানের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কয়েকটি সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের একটি বড় অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ সংগঠনটির পদধারী নেতা ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক মনে করেন, ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের নিয়োগের মাধ্যমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ক্ষতিকর।”
শিক্ষক নিয়োগের বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট থাকা সত্ত্বেও একাধিক আন্দোলনের পরও শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসিক হল নির্মাণ সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, কেরানীগঞ্জে নতুন ক্যাম্পাসের জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও, অনেকের মতে সেটি কার্যকর সমাধানের চেয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের অংশ ছিল। কারও কারও দাবি, এর মাধ্যমে পুরোনো ক্যাম্পাসের ঐতিহ্য আড়াল করার প্রবণতাও দেখা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আমরা যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে যেতাম, তখন প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাইনি। এতে আমরা হতাশ হয়েছিলাম।”
এছাড়া বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষকই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্ত—এমন দাবিও করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের অভিযোগ, এর ফলে জুলাই আন্দোলনে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও বারবার উপেক্ষিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক রেজাউল করিমের কাছেও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন জুলাই আন্দোলনে বিতর্কিত শিক্ষক ও ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানালেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
এ বিষয়ে জবি ছাত্রদলের সদস্য সচিব সামসুল আরেফিন বলেন, "৫ আগস্টের পর থেকেই আমরা জুলাইয়ের বিরুদ্ধে যেসকল শিক্ষার্থী ও শিক্ষক অংশ নিয়েছিলো তাদের বিচারের দাবি জানিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু তখনকার জামাতপন্থী ভিসি রেজাউল করিম এ বিষয়ে কোনো গুরুত্ব দেয় নি। সে অনেক গোপনীয় নথি লুকিয়েছে। এখন খুঁজে বের করা খুবই কষ্টকর ব্যাপার। এখন তাদের খুঁজে বের করতে গেলেই তারা বলে জামাত করে। পূর্বের ছাত্রলীগ যেমন এখনকার শিবির তেমনই পূর্বের আওয়ামী লীগ শিক্ষক এখন জামাত পন্থী শিক্ষকে পরিণত হয়েছে।"
এ বিষয়ে সাবেক প্রক্টর তাজামুল হক বলেন, “১০-১২ জন বাদে অধিকাংশ শিক্ষকই আওয়ামী লীগের সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্ত। বিএনপি ও জামায়াতপন্থী শিক্ষক মিলিয়ে সংখ্যাটা খুবই কম। কিছু নিরপেক্ষ শিক্ষক আছেন, তবে তারা সংখ্যায় সীমিত।”
সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক রইস উদ্দীন কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, "পূর্বে শিক্ষক নিয়োগে অনেক ক্ষেত্রে দলীয় ক্যাডারদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এটা সত্য। তবে আমার সময়ে এমন হতে দেওয়া হবে না। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আমি লিখিত ও ডেমো ক্লাসের মাধ্যমে যাচাই করে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা করছি। এছাড়া যারা জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের উপর হামলায় অংশগ্রহণ করেছে তাদের কে চিহ্নিত করার জন্য কাজ চলছে। আশা করি দ্রুত এসব বাস্তবায়ন হবে।"
সামগ্রিকভাবে শিক্ষক নিয়োগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন—এই তিন ক্ষেত্রেই দলীয় প্রভাবের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চশিক্ষার মান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষায় এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এখন জরুরি।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
ক্যাম্পাস এর সর্বশেষ খবর