• ঢাকা
  • ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ২৬ সেকেন্ড পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:২৭ দুপুর

সাগরে নিখোঁজ, তীরে কান্না

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

কক্সবাজারের টেকনাফ সদর ইউনিয়নের লেঙ্গুরবিল গ্রামের মোস্তাক আহমদের বাড়িতে এখন শোকের ভারী নীরবতা। বয়স মাত্র ২৭। তিন বছর আগে বিয়ে করেছিলেন। দেড় বছরের এক শিশু সন্তান আছে। কৃষিকাজে কোনোমতে চলা সংসার ছেড়ে উন্নত জীবনের স্বপ্নে পা বাড়িয়েছিলেন সমুদ্রপথে। দালালের প্রলোভনে সেই যাত্রাই এখন পরিবারের কাছে এক অন্তহীন দুঃস্বপ্ন।

দালালরা প্রথমে তিন লাখ বিশ হাজার টাকা দাবি করলেও পরে তা কমিয়ে দুই লাখ আশি হাজারে আনে। টাকা জোগাড়ের আগেই নিখোঁজ হয়ে যান মোস্তাক। শেষবার ফোনে বলেছিলেন শুধু- দোয়া করো। এরপর আর কোনো খবর নেই। কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মোস্তাকের স্ত্রী ইসমত আরা। পাশেই ভাইয়ের ছবি আঁকড়ে ধরে নীরবে কাঁদেন বোন ছাদেকা।

একই চিত্র পেকুয়ার রাজাখালী ইউনিয়নের মিয়ারপাড়া গ্রামে। বেলাল উদ্দিনও পাড়ি জমিয়েছিলেন একই স্বপ্নে। বারো দিন ধরে তার কোনো খোঁজ নেই। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আয়েশা বেগম দুই সন্তানকে বুকে জড়িয়ে বিলাপ করেন- সে বেঁচে আছে, না সাগরে ডুবে গেছে, আমি জানি না। এই বাচ্চাদের নিয়ে কীভাবে বাঁচব?

শুধু এই দুই পরিবার নয়। কক্সবাজার উপকূলের শতাধিক পরিবার এখন একই অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর প্রতীক্ষার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। কেউ ছুটছেন থানায়, কেউ ঘুরছেন জনপ্রতিনিধিদের দরজায়- কিন্তু প্রশ্নের উত্তর মিলছে না প্রিয়জনেরা কোথায়?

বেঁচে ফেরা কয়েকজনের বর্ণনায় উঠে এসেছে সেই বিভীষিকার গল্প। গত ৪ এপ্রিল উখিয়া, ইনানী ও টেকনাফের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ছোট নৌকায় করে শত শত মানুষকে তোলা হয় একটি বড় ট্রলারে। যার নাম তানজিনা সুলতানা। নারী, শিশু, রোহিঙ্গাসহ প্রায় আড়াই শত থেকে আড়াইশো আশিজন মানুষ গাদাগাদি করে উঠেছিলেন সেই ট্রলারে। গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া। কিন্তু ছয় দিনের মাথায় ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে পৌঁছেই বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ট্রলারটি ডুবে যায়।

বেঁচে ফেরা রোহিঙ্গা যুবক রফিকুল ইসলাম বলেন, 'ট্রলারে অনেক মানুষ ছিল। দাঁড়ানোর জায়গাও ছিল না। ঝড়ের আঘাতে হঠাৎ ট্রলারটা ডুবে গেল। আমরা সাগরে ভেসে ছিলাম।' একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করে এবং ১৩ এপ্রিল বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করে।

আরেকজন রোহিঙ্গা যুবক ইমরান বলেন, 'ক্যাম্পের জীবন থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এই যাত্রা দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।'

বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, উদ্ধার হওয়া নয়জনের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশি ও তিনজন রোহিঙ্গা। তবে ট্রলারে থাকা মানুষের সঠিক তালিকা না থাকায় নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে সবচেয়ে বেশি শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই নৌকাডুবিতে নারী-শিশুসহ অন্তত আড়াইশো জন নিখোঁজ হয়েছেন।

বাংলাদেশ যখন নববর্ষের উৎসবে মুখর, তখন কক্সবাজার উপকূলে অন্য বাস্তবতা। কক্সবাজার পৌরসভার সমিতাপাড়ার মো. ইব্রাহিম ৪ এপ্রিল ট্রলারে ওঠার আগে বড় ভাইয়ের কাছে ফোনে দোয়া চেয়েছিলেন। তারপর থেকে নিখোঁজ। একই এলাকার হারুন, নূর ও শফির পরিবারও প্রতীক্ষায়।

উখিয়া-টেকনাফের অনেক স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীও নিখোঁজ বলে দাবি তাদের পরিবারের। সবাই শেষবার জানিয়ে গিয়েছিল- মালয়েশিয়া যাচ্ছে। কেউ পরিবারের সম্মতিতে, কেউ গোপনে।

লেঙ্গুরবিল গ্রামের আয়েশা বেগম দিনের বেশিরভাগ সময় শূন্যতার দিকে তাকিয়ে থাকেন। ভাবেন, হয়তো কোনো ফোন আসবে। হয়তো কোনো খবর। একটা খবর দিলেও হতো...সে বেঁচে আছে কি না। বলতে গিয়ে ভেঙে পড়লেন তিনি।

রাত নামলে টেকনাফের লেঙ্গুরবিল কিংবা পেকুয়ার নতুন ঘোনায় আর আগের মতো নীরবতা নামে না। বাতাসে ভেসে আসে কান্নার শব্দ। কারও স্বামী, কারও ছেলে, কারও ভাই- সবাই যেন হারিয়ে গেছে হাজার কিলোমিটার দূরের আন্দামান সাগরের অন্ধকারে।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, এই ঘটনার পেছনে একটি শক্তিশালী মানবপাচার চক্র সক্রিয়। পরিবারগুলোর অভিযোগ, শাকের মাঝি, হায়দার আলী, আব্দুল আমিন, সৈয়দ উল্লাহ, মো. ইব্রাহীম, আজিজুল হক, নুরুল কবির বাদশা, মোহাম্মদ উল্লাহ ও মোজাহের মিয়াসহ বেশ কয়েকজন দালাল দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসায় জড়িত।

স্থানীয় সূত্র বলছে, উখিয়া ও টেকনাফের অন্তত সাতটি রুট দিয়ে নিয়মিত মানুষ পাচার করা হয়। ঘটনার পর বেশিরভাগ দালাল আত্মগোপনে গেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের ধরার কার্যক্রম তেমন দৃশ্যমান নয়।

টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা হয়েছে।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, 'আন্দামান সাগরের ঢেউ শুধু একটি ট্রলার নয়, গিলে নিয়েছে শত শত মানুষের স্বপ্ন, পরিবারের ভবিষ্যৎ। পেছনে রেখে গেছে অপেক্ষা, কান্না আর এক গভীর নীরবতা।'

আমরা কক্সবাজারবাসী'র সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীন ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, 'কক্সবাজার উপকূল থেকে মালয়েশিয়া উপকূলের দূরত্ব প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার। শীত মৌসুমের শান্ত সাগরে যা অনায়াসে পাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন দালালচক্র। এটি প্রকাশ্যে ঘটে। কিন্তু আমাদের প্রশাসন মানবপাচার প্রতিরোধ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। তারা কেবল ঘটনার পরে দায়সারা দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট। এতে কোনো প্রাণ রক্ষা পায় না।'

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, 'মানবপাচার ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদী কার্যক্রমে রাষ্ট্রকে নিয়োজিত হতে হবে। প্রয়োজনে টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। যেকোনো মূল্যে এই সলিলসমাধি বন্ধ করতে হবে।'

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, গত নয় বছরে রোহিঙ্গাদের কোনো প্রত্যাবাসন হয়নি। তারা নিজ দেশে ফিরতে পারছে না, বরং এখনো নতুন করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছে। এতে একটি গভীর হতাশাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা অনেককে ঝুঁকিপূর্ণভাবে সাগরপথে অজানা গন্তব্যে পাড়ি দিতে বাধ্য করছে।

তিনি বলেন, 'এই পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় হওয়া জরুরি। তা না হলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়বে।'

সাম্প্রতিক ট্রলারডুবির ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ওই যাত্রা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে সমুদ্রে আবহাওয়া টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে, এ সময় কাঠের নৌকায় এ ধরনের যাত্রা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

তিনি আরও জানান, সরকার দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজখবর নিচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

মানবপাচারকারীদের বিষয়ে তিনি বলেন, 'যারা এসব মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত, বিশেষ করে যদি তারা বাংলাদেশি নাগরিক হয়, তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা আশা করি, দ্রুত মূল হোতাদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।'

তিনি সবাইকে আহ্বান জানান, যেন কেউ ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সাগরযাত্রায় অংশ না নেয় এবং মানবপাচার রোধে সবাই সচেতন ভূমিকা রাখে।

জাতিসংঘ ও আইওএমের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়- বরং দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, সীমিত সুযোগ আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের এক নির্মম প্রতিফলন। কক্সবাজার উপকূলে এখন প্রতিটি বাড়ি যেন একটি অপেক্ষার ঘর। কেউ এখনো আশা ছাড়েননি। কেউ হয়তো মনে মনে বুঝে গেছেন- প্রিয়জনের ফেরার আর সম্ভাবনা নেই।

সালাউদ্দিন/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:

BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ info@bd24live.com
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ office.bd24live@gmail.com